ঠিক যেন সত্তরের দশকের শেষ দিকে মুক্তি পাওয়া বলিউড চলচিত্র মিস্টার নটবরলাল চরিত্রের বাঙালি এডিশন কসবা টিকাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ভুয়া আইএএস দেবাঞ্জন দেব। তদন্ত যত এগোচ্ছে দেবাঞ্জনের একের পর এক প্রতারণার খবরে চমকে যাচ্ছেন গোয়েন্দারা। ভারতের কোভিশিল্ড নির্মাতা সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউটকে টিকা চেয়ে কলকাতা পৌরসভার নামে খোলা ইমেইল আইডি থেকে মেইল করেছিল পৌরসভার ভুয়া যুগ্ম কমিশনার দেবাঞ্জন দেব!
অভিযুক্তের গাড়ি চালকের দাবি, ভোটার তালিকা নিয়েও কাজ হতো দেবাঞ্জনের অফিসে। প্রতিদিনই তার সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য উঠে আসছে। তাতে তার প্রতারণার জাল কতদূর ছড়িয়েছে তা খুঁজে বের করাই এখন গোয়েন্দাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। জানা গেছে, টিকা প্রতারণা কাণ্ডে দেবাঞ্জনের অফিসের ১০ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, টিকা চেয়ে কোভিশিল্ড নির্মাতা সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউটকে ইমেইল করেছিল দেবাঞ্জন। এই মেইলটি সঠিক কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেরাম তাকে টিকা দিয়েছিল কিনা তারও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। দেবাঞ্জনের নথি থেকে জানা গেছে, সে কলকাতা পৌরসভার নামে ইমেইল অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। সেখানে নিজেকে ম্যানেজার বলে দাবি করেছে সে। ওই আইডি থেকেই তিনি বিভিন্ন অবৈধ কাজ করছিল বলে অভিযোগ উঠছে।
কলকাতা পৌরসভার শাখা অফিসের কায়দায় নিজের অফিস সাজাতেই ২০ লাখ রুপির ওপর খরচ করেছিল দেবাঞ্জন। তার অফিসের কম্পিউটার হার্ডডিক্সে ফটোশপে তৈরি করা পৌরসভার ব্যানার, লিফলেট, লেটারহেড পাওয়া গেছে।
২০২০ সাল থেকে দেবাঞ্জন কলকাতার পৌরসভায় যাতায়াত শুরু করে মাস্ক আর স্যানিটাইজার ব্যবসাকে সামনে রেখে। বিনামূল্যে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণের মধ্য দিয়ে একাধিক কাউন্সিলরের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়। এই সূত্র ধরেই পৌরসভার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার পরিচিতি তৈরি হয়। একটা সময় নিজেকে আইএএস অফিসার বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করে। পৌরসভার একাধিক নথিপত্র সংগ্রহ করা শুরু করে জাল নথি তৈরি করার জন্য।
দেবাঞ্জনের অফিস থেকে পৌরসভার বিল্ডিং বিভাগের কয়েকটি ফাইল পাওয়া গেছে। ফটোশপকে কাজে লাগিয়ে পৌরসভার লেটার হেড আর নোটিসের ফরম্যাট নিজের ইচ্ছামতো তৈরি করেছে দেবাঞ্জন তার অফিসের কম্পিউটারে। শিয়ালদহের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সেগুলো ছাপানো হতো। একইভাবে ডালহৌসি থেকে সে তৈরি করিয়েছিল পৌরসভার ভুয়া রাবার স্ট্যাম্প।
২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত টেন্ডার ডেকে পৌরসভার যে যে কাজ হয়েছে, তার বড় অংশই ছিল দেবাঞ্জনের নখদর্পণে। পৌরসভার ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে তাদের বলে, তাকে সাব কন্ট্রাকটর করা হলে সে সহজেই কাজ পাইয়ে দেবে।
করোনার টিকা দেওয়া নিয়ে পৌরসভার এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিরোধ হয় তার। দেবাঞ্জন বেশকিছু টিকা পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা জোগাড় করতে না পেরে খোলা বাজার থেকে অন্য ওষুধ কিনে সেটাই টিকা হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
এদিকে, দেবাঞ্জনের গাড়ির চালক মিঠুন দেবনাথ দাবি করেছেন, ভোটার তালিকা নিয়ে কাজ চলতো কসবার অফিসে। এ নিয়ে কথা বলতেন দেবাঞ্জন ও তার সহযোগী শান্তনু মান্না। সব কাজেই গোপনীয়তা বজায় রাখা হতো। চালকের কারও সঙ্গে কথা বলা সে পছন্দ করতো না। এমনকি, কথা বললে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দিতেন।
এই নতুন তথ্য নিয়ে উঠছে প্রশ্ন! ভোটার তালিকা নিয়ে কী করতেন দেবাঞ্জন? তালিকায় নাম তোলার কাজ করতেন কী? আর তা যদি হয় তাহলে কাদের নাম তুলতো সে? অনুপ্রবেশকারী বা জঙ্গিরা ধরা পড়লে তাদের কাছে ভোটার কার্ড পাওয়া যায়। দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন সময় মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ভোটার লিস্টে ভুয়া পরিচয় দিয়ে নাম তুলে নেয় বা নকল ভোটার কার্ড বানিয়ে নেয় নিরাপদে থাকার জন্যে। এক্ষেত্রে কী তাহলে বড় কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
এখনও পর্যন্ত দেবাঞ্জনের ৮টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিস মিলেছে। তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলছেন তার সংস্থারই কর্মী সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুস্মিতার দাবি, তারা কেউ জানতেন না যে, সে ভুয়া আইএএস অফিসার। পরে বুঝতে পেরেছেন, তারা প্রতারণার শিকার।
তার সংস্থার কর্মীরাই শুধু নয়, প্রতারণার শিকারদের তালিকায় আছেন দেবাঞ্জনের এক সময়ের গৃহশিক্ষকও। বিএসএসি পড়ার সময় সোনারপুরের ওই শিক্ষককে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি টলিউডের আইডি কার্ড করে দেওয়ার নামে পাঁচ হাজার রুপি হাতিয়ে নিয়েছিল দেবাঞ্জন।









