ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের কট্টর সমালোচক এক সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে দেশটির পুলিশ। তিনি হলেন ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট এএলটি নিউজের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জুবায়ের। পুলিশের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে টুইটারে ধর্মীয় বিশ্বাসকে হেয়প্রতিপন্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের বিরোধী রাজনীতিক ও সাংবাদিকরা। তারা বলছেন, যারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়, তাদের দমনের জন্য এটি ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের একটি নগ্ন হস্তক্ষেপ।
মোহাম্মদ জুবায়ের সম্প্রতি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মুখপাত্রের করা একটি বক্তব্যের ভিডিও টুইটারে শেয়ার করেন। টিভি বিতর্কে করা বিজেপি মুখপাত্রের ওই বক্তব্যে মহানবী (সা)-কে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। তার টুইটটি ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়। বিজেপি সমর্থকদের দাবি, তার ওই টুইটের জের ধরেই দলটির মুখপাত্রের বক্তব্য নিয়ে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মোহাম্মদ জুবায়েরের অতীতে করা মন্তব্য সামনে আনছেন। তাদের দাবি এসব মন্তব্যে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ায় জুবায়েরের বিচার হওয়া উচিত।
কে এই জুবায়ের?
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ জুবায়ের সাবেক প্রকৌশলী প্রতীক সিনহার সঙ্গে ২০১৭ সালে গড়ে তোলেন ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট এএলটি নিউজ। ফেক নিউজ ও অপতথ্য মোকাবিলায় পরিশ্রমী কাজ করে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় সাইটটি।
এএলটি নিউজের করা ফ্যাক্ট-চেকগুলো বারবার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন মোহাম্মদ জুবায়ের। টুইটারে তার পাঁচ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। গত সপ্তাহে, জুবায়ের টুইটার থেকে পাওয়া একটি ই-মেইল পোস্ট করেন। এতে বলা হয়, মাইক্রোব্লগিং সাইটটি সরকারের কাছ থেকে একটি অনুরোধ পেয়েছে যাতে দাবি করা হয়েছে, তার অ্যাকাউন্ট ভারতীয় আইন লঙ্ঘন করেছে। পরে তিনি আরেকটি ইমেইল পান যাতে বলা হয়, হিন্দু গ্রুপের করা উস্কানিমূলক মন্তব্যের কারণে তার টুইটগুলো দেশের আইটি আইনের অধীনে ভারতে ব্লক করে রাখা হয়েছে।
সোমবার মোহাম্মদ জুবায়েরকে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে আনা অভিযোগে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, ২০১৮ সালে হিন্দু দেবতা হনুমানের নামে হোটেলের নাম রাখা নিয়ে মন্তব্য করায় জুবায়েরের বিরুদ্ধে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরে দিল্লি পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুবায়েরের টুইটার অনুগামীরা টুইটটি আরও ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ‘একটি বিতর্ক/ঘৃণা ছড়ানোর একটি সিরিজ তৈরি করেছে’। পুলিশ দাবি করেছে তদন্তে জুবায়েরের আচরণ ‘সন্দেহজনক’ পাওয়া গেছে যা ‘তাকে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নিশ্চয়তা দিয়েছে’।
এএলটি নিউজের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রতীক সিনহা জানিয়েছেন কোন অভিযোগের ভিত্তিতে জুবায়েরকে আটক করা হয়েছে তার কোনও কপি তাদের আইনজীবীদের দেয়নি পুলিশ। আটকের পর তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাও প্রাথমিকভাবে বলা হয়নি।
সোমবার স্থানীয় এক আদালতে জুবায়েরকে তোলা হয়। সেখানে তাকে এক দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গে তার আইনজীবীদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
ঘৃণাত্মক বক্তব্যের উপর কট্টর নজর রাখার জন্য পরিচিত জুবায়ের। তার টুইটার পোস্টগুলোতে বিজেপির সমর্থকেরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থাকে।
বহু সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ জুবায়েরকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মুসলিম সাংবাদিক রানা আইয়ুব বলেন, নিয়মিতভাবে ফেইক নিউজ, ভারতে ঘৃণা তৈরিকারী উপকরণগুলো ফাঁস করা জুবায়েরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই পতন যারা নথিভুক্ত করছে, প্রকাশ করছে দেশ তাদেরই শাস্তি দিচ্ছে’।
বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘বিজেপির ঘৃণা, ধর্মান্ধতা এবং মিথ্যার প্রকাশ ঘটানো প্রত্যেক ব্যক্তি তাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। সত্যের একটি কণ্ঠ গ্রেফতার করলে আরও হাজার হাজারের জন্ম হবে’।
জুবায়ের কী টুইট করেছিলেন?
পুলিশ বলছে তারা ‘হনুমান ভক্ত’ নামের একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে করা পোস্টের ভিত্তিতে মোহাম্মদ জুবায়েরকে গ্রেফতার করেছে। বেনামী এই অ্যাকাউন্টটি গত অক্টোবরে তৈরি করা হয়। মঙ্গলবার সকালের আগে পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটির মাত্র একজন অনুসারী ছিল। পরে দ্রুত তা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে এক হাজার চারশ’তে পৌঁছায়।
জুবায়েরের বিরুদ্ধে অভিযোগটি ২০১৮ সালের এক টুইটের ভিত্তিতে আনা হয়েছে। ওই টুইটে তিনি সেসময় একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন। ওই ছবিতে দেখা যায় একটি হোটেলের সাইনবোর্ডে নাম পরিবর্তন করে ‘হানিমুন হোটেল’ থেকে ‘হনুমান হোটেল’ করা হয়েছে। অনেকেই উল্লেখ করছেন, ছবিটি মূলত একটি স্ক্রিনশট। যা প্রখ্যাত পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জির ১৯৮৩ সালের বলিউড কমেডি সিনেমা থেকে নেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ জুন ‘হনুমান ভক্ত’ অ্যাকাউন্ট থেকে চার বছর আগের পুরনো টুইটটি শেয়ার করে বলা হয়, এটা হিন্দুদের ‘সরাসরি অপমান’। অ্যাকাউন্টটি থেকে দিল্লি পুলিশকে ট্যাগ করা হয় এবং অবিলম্বে জুবায়েরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে বলা হয়।
সূত্র: বিবিসি









