ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির গণসমাবেশ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক ওঠে আসে। গণসমাবেশটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের ইসলামপন্থী মিত্রদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলা হয় প্রতিবেদনে। বিএনপির পক্ষ থেকে এ সমাবেশকে কেন্দ্রীয় সমাবেশে রূপ দেওয়ার ধারণা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি নেতারা বলেছিলেন যে তারা সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ‘রাজপথ থেকে সরকার ঘোষণা’ দিতে যাচ্ছেন।
কিন্তু সমাবেশে উপস্থিতি ছিল কম—টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ড্রোন উড়িয়ে যেসব ভিডিও নিয়েছিল সেগুলোতে স্থানে স্থানে ফাঁকা দেখা গেছে। লাখ লাখ মানুষ হবে সমাবেশে—বিএনপির শীর্ষ নেতাদের এতদিন বলে আসা কথাগুলো বাস্তবে ফিকে হয়ে গেছে।
পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, "সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্দর নগরী চট্টগ্রাম বা সমুদ্র উপকূলীয় শহর কক্সবাজারে যে জনসভা করেছেন সেগুলোর তুলনায় ঢাকায় বিএনপির সমাবেশটি নিতান্তই কম উপস্থিতির।"
যদিও বিএনপি বলে আসছিল—তারা ঢাকার সমাবেশ থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করবে। কিন্তু তারা সমাবেশ শেষ করেছে—সংসদে তাদের দলীয় আইনপ্রণেতাদের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েই।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির যে ৭ জন সংসদ সদস্য দায়িত্ব ছাড়তে পদত্যাগপত্র দিচ্ছেন তারা হলেন— মো. জাহিদুর রহমান, মো. মোশারফ হোসেন, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. হারুনুর রশীদ, আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া ও রুমিন ফারহানা।
আগের মতোই বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। সমাবেশে সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ ১০ দফা দাবি ঘোষণ করে বিএনপি।
রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় জনসভা থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন দাবিগুলো ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, মিত্র দল ও বিএনপির সব অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে এসব দফা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উত্থাপিত ১০ দফা—
১. সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের পদত্যাগ।
২. ১৯৯৬ সালে সংযোজিত সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের খ, গ এবং ঘ ধারা অনুসারে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার/অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন।
৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। তারা সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম এবং দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল করবে।
৪. খালেদা জিয়া, সাংবাদিক ও ধর্মীয় নেতাসহ সকল বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত "মিথ্যা মামলা" প্রত্যাহার করতে হবে, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-সহ সব কালো আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও পানিসহ সরকারি পরিষেবার মূল্য বৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
৭. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা।
৮. গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সকলকে উদ্ধার করতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে।
৯. গত ১৫ বছরে ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে এবং শেয়ারবাজারে ঘটে যাওয়া দুর্নীতি চিহ্নিত করতে কমিশন গঠন করতে হবে।
১০. আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের কাজ স্বাধীনভাবে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া করতে দিতে হবে।
এর আগে, ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ১ ব্যক্তি নিহত এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়।
সমাবেশে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, যিনি এতিমখানার তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের মামলায় দণ্ডিত এবং বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় বাসায় অবস্থান করছেন, উপস্থিত হননি এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভার্চুয়ালি অংশ নেননি।
সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনের জন্য সমাবেশের তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছিল বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের সাথে মিলিয়ে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন—সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদসহ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা জেলা সমাবেশ দিয়ে শুরু হওয়া বিএনপির এ আন্দোলনকে যথেষ্ট চাঙ্গা করে তুলেছে।
জনসভাস্থল নির্ধারণে বিএনপি প্রথম ভুলটি করে। তারা রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ আয়োজনে অস্বীকৃতি জানায়। নয়াপল্টনে দলের সদর দফতরের সামনে এটি আয়োজন করার চেষ্টা করে। এসময়ে পুলিশের এক পদস্থ কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দেন, কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় সমাবেশের অনুমতি কোন প্রশাসনই তাদের দেবে না।
নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার ব্যাপারে পুলিশ যখন অটল, তখন বিএনপি নেতারা পিছু হটে। শেষে গোলাপবাগে সমাবেশ করতে রাজি হয়। যদিও স্থানটি বিপুল ধারণক্ষমতার ছিল না।
বিপুল জনসমাগম ছাড়া একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপি'র দাবিগুলোকে ম্লান করে দিবে। যেখানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে শেখ হাসিনার জনসভাগুলো ছিল সুবিশাল।
১০ ডিসেম্বর সমাবেশের আগের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ঘোষণাটি ছিল বিএনপির জন্য দ্বিতীয় বাধা। এতে বলা হয়েছে, "আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC), আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস এবং মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে ৪০ ব্যক্তি ও সংস্থার একটি তালিকা অনুমোদন দিচ্ছে যারা ৯টি দেশে দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত।"
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রেস নোটে বলা হয়েছে, "যুক্তরাষ্ট্র তার মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং স্বীকৃতি দেয় মানবাধিকারের যা বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত।"
বিএনপি এবং তার ইসলামপন্থী মিত্রদের জন্য বিপত্তিটা হলো—যদিও বিশ্বজুড়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে বেশ কয়েকটি সংস্থা, সেখানে বাংলাদেশের একটিও নেই। বিএনপির লবিস্টরা সোশাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছে বলে বাংলাদেশের কয়েকজন পুলিশ ও আধা-সামরিক কর্মকর্তার নামের তালিকা প্রচার করে আসছিল, যা বাস্তবে ঘটেনি। ওই তালিকাটির শীর্ষে ছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম। অতীতে সন্ত্রাস দমনে তার ভূমিকা প্রশংসা করেছিলেন এফবিআই কর্মকর্তারা ।
ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস, ১৯৭১ সালের এ মাসে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এবং তাদের ভারতীয় মিত্ররা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করেছিল।
এই ডিসেম্বরকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই শুরুর মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেশের জন্য নতুন আখ্যান রচনার চেষ্টা করছে বিএনপি। সেই আখ্যান এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।









