মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট উজরা জেয়া আজ (মঙ্গলবার) বাংলাদেশে পা রাখার আগে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আড়াই দিন বেশ ব্যস্ত সময় পার করলেন। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিস জেয়াসহ মার্কিন প্রতিনিধি দলের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ রীতিমতো বিশদেই আলোচিত হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এমনকি বাংলাদেশ নিয়ে ‘ইনপুট’ দেওয়ার জন্য ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত প্রণয় কুমার ভার্মাকেও দিনচারেক আগে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ফলে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভারতের আলোচনার সময় হাইকমিশনার ভার্মাও উপস্থিত ছিলেন।
রবিবার (৯ জুলাই) খুব সকালে দিল্লিতে এসে পৌঁছান বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী উজরা জেয়া। তার সঙ্গেই দিল্লিতে আসেন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লিউ এবং আমেরিকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। দুদিনেরও বেশি সময় দিল্লিতে কাটানোর পর তারা আজ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন।
বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, উজরা জেয়ার সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিশেষ করে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। সেগুলো হলো—
ক) বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে দিল্লি তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত মার্কিন প্রতিনিধি দলের কাছে তুলে ধরেছে। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ যে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার একটা নজির স্থাপন করেছে বলে ভারত বিশ্বাস করে, সে কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মার্কিন প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে।
খ) বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন, তাদের মিয়ানমারে ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে সুসমন্বিত ও যৌথ প্রচেষ্টার ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত বলেছে, রোহিঙ্গারা যাতে স্বভূমিতে ফিরতে পারেন তার জন্য প্রতিটি দেশই আলাদাভাবে চেষ্টা চালালেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না– কিন্তু এ ক্ষেত্রে যদি ওয়াশিংটন, দিল্লি আর ঢাকা একসঙ্গে মিলে উদ্যোগ নেয় সেটা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সুস্থিরতার স্বার্থে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত নিরসন করা যে জরুরি, বলা হয়েছে সে কথাও।
সোমবার (১০ জুলাই) উজরা জেয়া দিল্লিতে দেখা করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াটরার সঙ্গে। এরপর দিল্লির সাউথ ব্লকে তিনি আলাদাভাবে বৈঠকে বসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেক্রেটারি (ওয়েস্ট) সঞ্জয় ভার্মার সঙ্গেও। এসব বৈঠকেই ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা বিষয়সহ বাংলাদেশ প্রসঙ্গেও তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তবে রবিবার দিল্লিতে পা রেখেই উজরা জেয়াসহ মার্কিন প্রতিনিধি দল এমন একজনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যা রীতিমতো কূটনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি আর কেউ নন, ভারতে বসবাসকারী তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামা।
চীনকে একটা বার্তা দিতেই যে সচেতনভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দিল্লিতে চীনা দূতাবাসও সঙ্গে সঙ্গেই কঠোর প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেছে, ‘তিব্বত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় পুরোপুরি চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার– আর এখানে কোনও বৈদেশিক শক্তির হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।’
উজরা জেয়া অবশ্য তার দক্ষিণ এশিয়া সফরের ঠিক আগেই টুইটারে ঘোষণা করেছিলেন, তার সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে একটি মুক্ত, অবাধ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক নিশ্চিত করা। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ যে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে খর্ব করার চেষ্টা তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের কোনও সন্দেহ নেই– আর দালাই লামার সঙ্গে তার বৈঠকের মধ্য দিয়েও সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে।
আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে দিল্লির চাণক্যপুরীতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে উজরা জেয়া ও তার সফরসঙ্গীরা ভারতীয় সুশীল সমাজের বাছাই করা প্রতিনিধিদের সঙ্গেও এক মতবিনিময়ে মিলিত হয়েছেন।
এছাড়া ব্যস্ত সফরসূচির মাঝেও সময় বের করে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি দিল্লির বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানও ঘুরে নিয়েছেন। এমনকি, আইটিসি মৌরিয়া শেরাটনের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ‘বুখারা’– যেখানে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন বা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতো ভিভিআইপিরাও দিল্লিতে এসে ডিনার করেছেন– সেখানেও সোমবার রাতে নৈশভোজ সেরেছেন উজরা জেয়া। প্রায় সব বৈঠকেই তার সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এরিক গার্সেটিও।









