ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেসে বুধবার পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনের কাছে যেভাবে বোমা হামলা চালানো হয়েছে তাতে ভারত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন। দু’দেশের মৈত্রীর প্রতীক বলে ধরা হয় ওই ট্রেনটিকে, সেটির ওপর এই হামলাটি বিরোধী দল বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকরাই চালিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে– এবং ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
খবরে প্রকাশ, বুধবার (১ নভেম্বর) কলকাতা থেকে ঢাকাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস যখন বেলা বারোটা নাগাদ পাবনা জেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই ওই হামলা চালানো হয়। বুধবার ছিল বিরোধী দল বিএনপি’র ডাকা অবরোধের দ্বিতীয় দিন– আর সেই কর্মসূচি চলাকালীনই চলন্ত ট্রেনটি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
পর পর দুটি বোমা ছোড়া হলেও সেগুলো অবশ্য লক্ষ্যভ্রষ্টই হয়েছে বলা যায়– তবে ট্রেনের ঠিক পাশে প্রচণ্ড শব্দে বোমাগুলো বিস্ফোরিত হয়। ট্রেনের যাত্রীরা অবশ্য কপালজোরে বেঁচে গেছেন– বিস্ফোরণে কেউ জখম হননি।
তবে ঈশ্বরদী থানার ওসি’কে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মৈত্রী এক্সপ্রেসের এসি কোচের একটি জানালা ওই বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রেনের গায়েও বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখা গেছে। পরে অবশ্য ট্রেনটি যথাসময়েই ঈশ্বরদী থেকে ছেড়ে ঢাকায় পৌঁছে যায়।
দুপুরে ট্রেনটির ওপর এই হামলার খবর আসতেই ঢাকাতে ভারতীয় হাইকমিশন নড়েচড়ে বসে এবং দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। হামলার ঘটনাটি বিএনপির কর্মী-সমর্থকরাই ঘটিয়েছেন, এই খবর আসতে তাদের কপালেও যথারীতি দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
এই ঘটনার বিষয়ে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা বুধবার বিকালে দিল্লিতে কূটনৈতিক চ্যানেলে যে নোট পাঠিয়েছেন, তার একটি প্রতিলিপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে: “কলকাতা থেকে ঢাকা-অভিমুখী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেস পাবনার ঈশ্বরদীতে সন্দেহভাজন বিএনপি কর্মীদের হাতে তাদের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালীন আক্রান্ত হয়েছে। ঘটনাটি ১ নভেম্বর বেলা বারোটা নাগাদ ঘটেছে।”
“হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন যুবক ট্রেনটি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা, পাথর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং ট্রেনের কাঁচের জানালা ভেঙে দেয়। ওই হামলার পরই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান।”
ঘটনাটির সঙ্গে বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের যোগসাজশ আছে, এই বিষয়টিই ভারতকে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
গত ২৮ অক্টোবর থেকে বিএনপি যে একের পর এক সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তুলতে চাইছে, তা নিয়ে ভারত সরকার এখনও সরকারিভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি। কিন্তু মৈত্রী এক্সপ্রেস আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি দিল্লিকে খুবই বিচলিত করেছে– এবং কে বা কারা এর পেছনে আছে তারা সে বিষয়ে বিস্তারিত আরও তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছেন।
ভারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এদিন বলেন, “যে দিন দুই বন্ধু দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগের উদ্বোধন করছেন কিংবা রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট চালু করার কথা ঘোষণা করছেন– সেই একই দিনে মৈত্রী এক্সপ্রেসে পেট্রোল বোমা ছোড়া হচ্ছে, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক!”
হামলাকারীদের পরিচয় সম্বন্ধে ভারত এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত না-হলেও তারা যে ‘ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চায় না’– সেটা নিয়েও দিল্লির কর্মকর্তাদের কোনও সংশয় নেই। ঠিক এই কারণেই মৈত্রী এক্সপ্রেসকে আক্রমণের নিশানা করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
ভারতের নর্থ ব্লকেও একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, বিএনপি সাম্প্রতিক অতীতে বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছে তারা তাদের পুরনো ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি থেকে সরে আসছে।
“কিন্তু এর পরও যদি বিএনপি’র আন্দোলনে মৈত্রী এক্সপ্রেস আক্রান্ত হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তাদের ওই সব বক্তব্য নেহাতই কথার কথা। সে ক্ষেত্রে আমাদের নীতি কী হবে, সেটা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে”, বলছিলেন তিনি।









