বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা হিসেবে পরিচিত জাফরান। গাঢ় লাল রঙের এই মসলাকে বলা হয় ‘লাল সোনা’। তবে ভারতের কাশ্মীরে শতাব্দীপ্রাচীন জাফরান চাষ এখন জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও খাদ্যে ভেজালের কারণে সংকটের মুখে পড়েছে। কমছে উৎপাদন, বাজারে বাড়ছে বিদেশি জাফরানকে কাশ্মীরি পরিচয়ে বিক্রির প্রবণতা। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কাশ্মীরের শ্রীনগরের একটি বাজারে জাফরান কিনতে গিয়ে সংকটের চিত্র দেখা যায়। এক দোকানি প্রথমে কাশ্মীরি জাফরান দেখাতে ইতস্তত করেন। পরে কাপড়ে মোড়ানো একটি ছোট পাত্র থেকে কয়েকটি গাঢ় লাল রঙের জাফরান দেখান। এগুলো পাম্পোর অঞ্চলে উৎপাদিত বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, ওই বছর উৎপাদন ছিল খুবই কম। পরে উজ্জ্বল লাল রঙের আরেকটি পাত্র দেখিয়ে জানান, সেগুলো ইরানি জাফরান। অনেক দোকান এখন এগুলো কাশ্মীরি নামে বিক্রি করছে।
কাশ্মীরের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে জাফরান চাষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বিয়ের খাবার, নুন চা, ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এই মসলা। পাম্পোর অঞ্চল শতাব্দী ধরে জাফরান চাষের জন্য পরিচিত।
জাফরান আসে ‘ক্রোকাস স্যাটিভাস’ নামের একটি বেগুনি ফুলের গাছ থেকে। প্রতিটি ফুলে থাকে তিনটি গাঢ় লাল গর্ভমুণ্ড। মান বজায় রাখতে ভোরের আগে হাতে ফুল সংগ্রহ করে সেগুলো আলাদা ও শুকানো হয়। এক আউন্স বা ২৮ গ্রাম জাফরান উৎপাদনে প্রায় চার হাজার ফুল প্রয়োজন হয়। বছরে মাত্র দুই থেকে চার সপ্তাহ ফুল ফোটে বলে উৎপাদন প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য। কাশ্মীরি জাফরানের গাঢ় রং, মোটা গর্ভমুণ্ড ও তীব্র সুগন্ধের জন্য বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। প্রতি গ্রাম জাফরানের দাম চার ডলার বা তার বেশি হতে পারে।
উৎপাদন কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন
গত এক দশকে কাশ্মীরের জাফরান উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, কাশ্মীর ও আশপাশের জম্মু অঞ্চলে ২০১০-১১ সালে উৎপাদন ছিল আট টন। ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ টনে।
গবেষকদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাত জাফরান ফুল ফোটা এবং মাটির নিচে থাকা কন্দের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময় শুষ্ক আবহাওয়া থাকলে ফলন কমে যায়।
কাশ্মীরভিত্তিক জলবায়ু গবেষক রাবিয়া খান বলেন, শরৎকালের শুষ্ক সময় দীর্ঘ হচ্ছে এবং তুষারপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও মাটির আর্দ্রতা প্রভাবিত হচ্ছে। চাষি আবদুল রশিদ ওয়ানি জানান, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এখন সেচের জন্য পাম্পের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
২০১০ সালে উৎপাদন বাড়াতে ভারতের সরকার ন্যাশনাল স্যাফরন মিশন চালু করে। এর আওতায় সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, কন্দ পুনরুজ্জীবিত করা এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে চাষিদের অভিযোগ, কোথাও পাইপলাইন নষ্ট, কোথাও অনিয়মিত পানি সরবরাহ। এদিকে সড়ক সম্প্রসারণ ও আবাসিক-বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে জাফরান চাষের জমিও কমছে। সজারু ও ইঁদুরের আক্রমণে মাটির নিচে থাকা কন্দ নষ্ট হওয়ার সমস্যাও রয়েছে।
ভেজাল জাফরানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ জাফরান উৎপাদন করে ইরান। সেখান থেকে আমদানি করা জাফরান নতুন মোড়কে কাশ্মীরি নামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দিল্লির এক ব্যবসায়ী জানান, ক্রেতারা কাশ্মীরি জাফরান চান, কিন্তু মোড়কজাত করার পর অধিকাংশের পক্ষে আসল-নকল চেনা কঠিন।
জাফরানে স্যাফফ্লাওয়ার বা হলুদ মেশানো এবং ক্ষতিকর রং ব্যবহারের ঘটনাও রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের খাদ্যবিজ্ঞানী শাজিয়া মালিক বলেন, ভেজাল ও ভুল পরিচয়ে জাফরান বিক্রি হলে ক্রেতাদের আস্থা কমে এবং স্থানীয় কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংকট মোকাবিলায় ডিজিটালভাবে পণ্যের উৎস শনাক্ত ও সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষ, কন্দ সংরক্ষণ এবং মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে পাম্পোরের কৃষকদের আশঙ্কা, আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণে একবার জাফরানের জমি হারিয়ে গেলে সেখানে আবার চাষ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কৃষক মোহাম্মদ আসিফের কথায়, জাফরান চাষ শুধু আয়ের উৎস নয়, শতাব্দী ধরে এখানকার মানুষের পরিচয় ও জীবনধারার অংশ।
সূত্র: বিবিসি