‘বিশ্বাসী’ থেকে বাগদাদির স্বঘোষিত ‘খলিফা ইব্রাহিম’ হয়ে ওঠা

বিদেশ ডেস্ক
২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৩৭আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ২৩:৪৫

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন কমান্ডোদের এক অভিযানে নিহত হয়েছেন জিহাদি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি। ট্রাম্পের দাবি অনুসারে তাকে হত্যার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাগদাদির উত্থান নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তার কিশোর বয়স থেকে আইএসের ‘খলিফা ইব্রাহিম’ হয়ে ওঠার কথা উঠে এসেছে।

বাগদাদির আসল নাম ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বাদরি

স্বঘোষিত ‘খলিফা ইব্রাহিম’-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। পাঁচ বছর পূর্বে আইএসের উত্থানের সময় থেকেই এই পুরস্কার বহাল ছিল।

উত্থানের চূড়ান্ত সময়ে আইএস সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল ও ইরাকের পূর্বাঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৮৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতো। দখলকৃত এলাকায় থাকা ৮০ লাখ মানুষের ওপর নির্মম ও নৃশংস শাসন জারি করে। তেল বিক্রি, চাঁদাবাজী ও অপহরণ বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি ডলার। কিন্তু দখলকৃত অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ হলেও জঙ্গি গোষ্ঠীটির নেতা ও সদস্যরা সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে যুদ্ধ পিপাসু রয়েছে এবং পরাজয় মেনে নিতে রাজি না।

‘বিশ্বাসী’

বাগদাদির আসল নাম ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বাদরি। মধ্য ইরাকের সামারা এলাকায় ১৯৭১ সালে তার জন্ম।

বাগদাদির সুন্নি আরব পরিবারের দাবি, তারা মুহাম্মদ (সা.) এর কোরাইশ জাতির বংশধর। খলিফা হওয়ার জন্য এট গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা বলে আধুনিক সুন্নি ধর্মবিদরা সাধারণভাবে মনে করেন।

শৈশবে তাকে আত্মীয়রা বিশ্বাসী বলে ডাকতেন। কারণ ওই সময় বাগদাদি স্থানীয় মসজিদে কোরআন তেলাওয়াত শিখতেন এবং ইসলামি আইন ও শরিয়া মেনে চলতেন।

আইএস প্রকাশিত বাগদাদির জীবন বৃত্তান্ত অনুসারে, ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে স্কুলের অধ্যয়ন শেষে রাজধানী বাগদাদে আসেন তিনি। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব বাগদাদ থেকে ইসলামি শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেন।

ছাত্র জীবনে তিনি বাগদাদের উত্তর-পশ্চিমের তোবচি জেলার একটি সুন্নি মসজিদের কাছে বাস করতেন। বলা হয়েছে, তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতেন। ব্যতিক্রম ছিল কোরআন তেলাওয়াত শেখানো এবং মসজিদের ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলার সময়। ওই সময় বাগদাদি সালাফিবাদ ও জিহাদিবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন বলে ধারণা করা হয়।

এই ক্যাম্প বুক্কাতে ১০ মাস বন্দি ছিলেন বাগদাদি

‘জিহাদি বিশ্ববিদ্যালয়’

২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর বাগদাদি জামায়াত জয়েশ আহল আল-সুন্নাহ ওয়াল জামাহ নামের একটি ইসলামি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন। এই গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। গোষ্ঠীটির শরিয়া কমিটির প্রধান ছিলেন বাগদাদি।

২০০৪ সালের শুরুর দিকে বাগদাদিকে পশ্চিম বাগদাদের ফালুজা শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা গ্রেফতার করে। পরে তাকে দক্ষিণের ক্যাম্প বুক্কার আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে এই ক্যাম্প বুক্কাকে আইএসের ভবিষ্যৎ নেতা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। এখানে তিনি বন্দিদের জঙ্গি মতাদর্শে রূপান্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

জানা গেছে, বাগদাদি আটককেন্দ্রে নামাজে ইমামতি করতেন, খুৎবা দিতেন এবং ধর্মীয় বিষয় শেখাতেন। মাঝে মধ্যেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কারা প্রশাসকরা মধ্যস্থতার জন্য ডাকতেন। ওই সময় তাকে খুব বেশি হুমকি মনে করেনি যুক্তরাষ্ট্র। দশমাস পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

২০১৪ সালে এক পেন্টাগন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, ২০০৪ সালে আমরা যখন তাকে গ্রেফতার করি তখন সে বড় কোনও কিছু ছিল না। তখন আমাদের পক্ষে ধারণা করা মুশকিল ছিল যে, একদিন সে আইএস প্রধান হয়ে যাবে।

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন অভিযানের পর আল-কায়েদায় যোগ দেন তিনি

ইরাকে আল-কায়েদা পুনর্গঠন

ক্যাম্প বুক্কা ছেড়ে যাওয়ার পর বাগদাদি নতুন করে গঠিক আল-কায়েদা ইরাকের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেন বলে ধারণা করা হয়। জর্ডানি আবু মুসাব আল-জারকাউয়ির নেতৃত্বে এই গোষ্ঠীটি ইরাকে গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়। শিরশ্ছেদসহ নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করে।

২০০৬ সালের শুরুর দিকে আল-কায়েদা ইরাক মুজাহিদিন শুরা কাউন্সিল নামের একটি জিহাদি সংগঠন গড়ে তুলে। এই গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে যোগ দেন বাগদাদি। ওই বছরের শেষের দিকে জারকাউয়ি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় নিহত হলে সংগঠনটি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে রাখে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক (আইএসআই)। বাগদাদি আইএসআই’র শরিয়া কমিটির তদারকি করতে এবং শুরা কাউন্সিলে যোগ দেন। ২০১০ সালে আইএসআই নেতা আবু উমর আল-বাগদাদি তার উপ-প্রধান আবু আইয়ুব আল-মাসরিসহ নিহত হলে নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন আবু বকর আল-বাগদাদি।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা, বাগদাদি এমন একটি সংগঠনের দায়িত্ব নেন যা কৌশলগতভাবে ভেঙে পড়ার পর্যায়ে ছিল। কিন্তু সাদ্দাম যুগের কয়েকজন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, যারা ক্যাম্প বুক্কাতে তার সঙ্গে বন্দি ছিল, তাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে আইএসআইকে পুনর্গঠন করেন।

মসুলের একটি মসজিদে খুৎবা দিচ্ছেন বাগদাদি

খলিফা ইব্রাহিম

২০১৩ সালের শুরুর দিকে ইরাকে এক মাসে বেশ কয়েকটি হামলা চালায় সংগঠনটি। একই সময়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয় তারা। ইরাক থেকে সিরীয় যোদ্ধাদের পাঠিয়ে আল-কায়েদার সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হয় আল-নুসরা ফ্রন্ট। সেখানে তারা অস্ত্রের ভাণ্ডার পেয়ে যায়।

এপ্রিলে বাগদাদি ইরাক ও সিরিয়ায় তার যোদ্ধাদের একীভূত করার ঘোষণা দেন ‘ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত’ বা আএস গঠনের মধ্য দিয়ে। আল-নুসরা ও আল-কায়েদা বাগদাদির এই ঘোষণা মেনে নেয়নি। তবে বাগদাদির প্রতি অনুগতরা আল-নুসরা থেকে বের হয়ে সিরিয়ায় আইএসকে সহযোগিতা করে।

২০১৩ সালের শেষ দিকে আইএস সিরিয়া থেকে নিজেদের মনোযোগ ইরাকে কেন্দ্রীভূত করে। ওই সময় শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার ও সংখ্যালঘু সুন্নি আরব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগ নেয় তারা। আদিবাসী ও সাদ্দাম হোসেনের অনুগতদের সহযোগিতায় তারা ফালুজার দখল নিতে সক্ষম হয়।

২০১৪ সালের জুন মাসে কয়েকশ আইএস জঙ্গি মসুল থেকে ইরাকি সেনাদের হটিয়ে দখল নেয়। এরপর বাগদাদের দিকে এগুতে থাকে। এই অভিযানে তারা শত্রুদের ব্যাপক আকারে হত্যা করে এবং অনেক আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ ও হত্যার হুমকি দেয়।

রাক্কাতে আইএস সদস্যদের উদযাপন

ওই মাসের শেষ দিকে বেশ কয়েকটি ইরাকি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আইএস নিজেদের খিলাফত ঘোষণা করে। তারা এটিকে ইসলামিক স্টেট হিসেবে নামকরণ করে। তাদের দাবি অনুসারে, এই খিলাফত পরিচালিত হতো পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা দ্বারা শরিয়া মোতাবেক। আইএস বাগদাদিকে ‘খলিফা ইব্রাহিম’ হিসেবে হাজির করে এবং মুসলিম বিশ্বকে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের দাবি জানায়।

পাঁচদিন পর প্রথমবারের মতো বাগদাদির একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, মসুলের আল-মসজিদে খুৎবা দিচ্ছেন তিনি। ওই বক্তৃতায় বিশ্বের মুসলিমদের তাদের দখলকৃত এলাকায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েক হাজার বিদেশি যোদ্ধা আইএসে যোগ দেয়।

এক মাসের মাথায় আইএস জঙ্গিরা ইরাকের কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অগ্রসর হয়। অভিযানে তারা কয়েক হাজার ইয়াজিদি ও কুর্দিকে বন্দি করে। এরপর ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালায়। সেপ্টেম্বরে বেশ কয়েকজন পশ্চিমা বন্দির শিরশ্ছেদের পর সিরিয়া হামলা শুরু করে জোট।   

/এএ/
সম্পর্কিত
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
ইরাকে অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা ইরানপন্থি দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর
সর্বশেষ খবর
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম