X
রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪
৩০ আষাঢ় ১৪৩১

আইসিসি কি পারবে নেতানিয়াহুর বিচার করতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ মে ২০২৪, ১৭:৩০আপডেট : ২১ মে ২০২৪, ১৯:২০

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর করিম খান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাসের তিন সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির জন্য আবেদন করেছেন। এই পদক্ষেপের পর গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেই তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এই খবরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা হবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের জন্য একটি নতুন যুগ। যা প্রমাণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অপরাধের বিচারও সম্ভব।

মানবাধিকার আইনজীবী ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক প্রসিকিউটর রিড ব্রডি বলেছেন, আইসিসি কখনও কোনও পশ্চিমা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেনি। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিচারের এই হাতিয়ারকে শত্রু ও নিজেদের বলয়ের বাইরের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্বের বিচ্ছিন্ন দেশগুলোর কাতারে ইসরায়েলকে রাখা দেশটির প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ইসরায়েলের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ও জাতিসংঘে কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ভূমিকা রাখছে ওয়াশিংটন।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও কলম্বিয়া ল’ স্কুলের অধ্যাপক সাহার কেনাকি বলেছেন, প্রসিকিউটরের ঘোষণার ফলে গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সহযোগিতাকারী দেশগুলো হয়তো আইনি ঝুঁকি পর্যালোচনা করবে। ইসরায়েলের সিনিয়র কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে যদি যৌক্তিকতা থাকে, তাহলে ইসরায়েলকে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলোরও একই অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আমরা হয়তো দেখতে পাবো যে ইসরায়েলে সামরিক সহযোগিতা সরবরাহ ও অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে।

প্রসিকিউটর করিম খানের ঘোষণার অর্থ হলো, আইসিসির বিচারকদের একটি প্যানেলকে গ্রেফতারি পরোয়ানার জারির বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

হামাস ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই উদ্যোগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব ইসরায়েলের জন্য গুরুতর হতে পারে। কয়েক দশক ধরে সামরিক দখলদারিত্বের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের নিপীড়নের কারণে ইসরায়েল ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। আর বর্তমান যুদ্ধের কারণে দেশটি ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রধান প্রসিকিউটরের সুপারিশের পর নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট এবং হামাস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচারকরা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সম্ভাবনা খুব বেশি। এই পরোয়ানা জারি হলে বিশ্ব ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আরও বিরুদ্ধে যেতে পারে।

কেনাকি বলেছেন, রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষরকারী সব দেশ আইসিসিকে সহযোগিতা করতে বাধ্য। কারও বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলে এসব দেশ সফরে তাকে অবশ্যই গ্রেফতার করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এর ফলে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও বিদেশ সফরের সুযোগ কমে যাবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থের পক্ষে থাকা, এমনকি ইসরায়েলপ্রীতি থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর করিম খানের এমন উদ্যোগে অনেক আইনি বিশ্লেষক অবাক হয়েছে। আইসিসির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা তার মধ্য দিয়েই এলো।

ব্রডি বলেছেন, অবৈধ বসতি স্থাপনসহ আইসিসিতে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে ফিলিস্তিনি অভিযোগের তদন্ত খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। প্রায় ১৫ বছরে পর পর তিন জন প্রসিকিউটর এই বিষয়ে কাজ করেছেন। ইউক্রেনে আক্রমণের জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করার ক্ষেত্রে করিম খান দ্রুত উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে তিনি খুব আগ্রহী ছিলেন না।

গাজায় নৃশংস ইসরায়েলি আগ্রাসন চলমান থাকার মধ্যেই পরোয়ানা জারির এই অনুরোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গাজায় ৩৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। ধ্বংস করা হয়েছে পুরো উপত্যকার অবকাঠামো। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার পর্যালোচনায় কয়েকটি স্থানে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত মানবিক ত্রাণের সরবরাহ ইসরায়েল বন্ধ করে দেওয়ায় এই দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গাজায় যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের নিন্দা চলছে বিশ্বজুড়ে। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয়, এশীয় এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে নিন্দা ও সমালোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।

ইসরায়েলি সরকার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) একটি গণহত্যার অভিযোগের মুখে পড়েছে। আইসিসির পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েল সরকার আরও চাপে পড়বে।

ব্রডি বলছেন, প্রসিকিউটরকে এই পদক্ষেপ নিতে কোন বিষয়টি বাধ্য করেছে তা জানা মুশকিল। কিন্তু আমি মনে করি, ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ, ইসরায়েলি পদক্ষেপ ও আইসিসির নিষ্ক্রিয়তার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক নিন্দা এবং গাজায় গণহত্যা কনভেনশনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের বিষয়ে আইসিজের মন্তব্য করিম খানের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ডিসেম্বরে আইসিসির সমাবেশে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানে খান ও তার দলের সদস্যরা বিভিন্ন দিক থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইসিসির অভিযোগ নিয়ে বিরোধিতা ও আক্রমণ করেছে। তিন বাক্যের এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে আইসিসি প্রসিকিউটরের গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন অযৌক্তিক। আমি স্পষ্ট করে বলছি, আইসিসি প্রসিকিউটর যা বলতে চান না কেন, হামাস ও ইসরায়েলকে একই কাতারে রাখা যায় না। ইসরায়েলের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় আমরা সবসময় দেশটির পাশে থাকবো।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, মূলত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইসিসি গঠনের চুক্তি রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষরকারী দেশ নয় যুক্তরাষ্ট্র। অতীতে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্ত করতে চাওয়া আইসিসির প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির হুমকি দিয়েছে দেশটি। ইসরায়েলও রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষর করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার পরও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইসরায়েলের সমালোচক দেশ হিসেবে পরিচিত আয়ারল্যান্ড। আইরিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইসিসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন। আইসিসি ও এর কর্মকর্তাদের হুমকির নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।

বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের জন্য একটি শক্তি হিসেবে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় আইসিসি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী দেশের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়তো নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি উদ্যোগ।

কলম্বিয়া ল’ স্কুলের অধ্যাপক কেনাকি বলেন, সাধারণভাবে আইসিসি ও আইসিজের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী বা শক্তিশালী দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানার সুপারিশের ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। সব সরকারের প্রতি একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাবে। তা হলো অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেছেন, ইউক্রেনে অপরাধের জন্য পুতিনের বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল অনেক পশ্চিমা দেশ। এবার সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া হবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের একটি পরীক্ষা।

সূত্র: দ্য ইন্টারসেপ্ট

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চান যুক্তরাজ্যের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হত্যাচেষ্টার পর ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান ট্রাম্পের
ফ্রান্সে জন্মদিনের পার্টিতে বন্দুক হামলায় নিহত ৪
সর্বশেষ খবর
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করা ঠিক নয়: জিএম কাদের
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করা ঠিক নয়: জিএম কাদের
সরকার সম্পূর্ণ নির্বিকার: এবি পার্টি
সরকার সম্পূর্ণ নির্বিকার: এবি পার্টি
জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে একসঙ্গে ৪ জনের মৃত্যু
জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে একসঙ্গে ৪ জনের মৃত্যু
গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চান যুক্তরাজ্যের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চান যুক্তরাজ্যের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’
কোটা আন্দোলনের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’
আমার বাসায় কাজ করেছে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক: প্রধানমন্ত্রী
আমার বাসায় কাজ করেছে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক: প্রধানমন্ত্রী
বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম কোটা আন্দোলনকারীদের
বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম কোটা আন্দোলনকারীদের
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ফল প্রকাশ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ফল প্রকাশ
‘অন্যের সন্তানকে নিজের দেখিয়ে’ কোটায় চাকরি, মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা
‘অন্যের সন্তানকে নিজের দেখিয়ে’ কোটায় চাকরি, মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা