আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হেলমান্দ প্রদেশে তালেবানের হামলায় অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০ জন। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত দুই দিনে হেলমান্দের প্রাদেশিক রাজধানীতে তালেবানের সঙ্গে পুলিশের তুমুল লড়াইয়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে সংঘর্ষে কোনও তালেবান সদস্যের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। মোল্লা হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদা আফগান তালেবানের নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই দেশটিতে তালেবানের প্রথম বড় ধরনের হামলা।
আঞ্চলিক পুলিশ কমান্ডার ইসমাতুল্লাহ দৌলতজাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবার তালেবানের হামলায় ২৪ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। এর আগে রবিবার তাদের হামলায় নিহত হন ৩৩ জন।
হেলমান্দকে আফগানিস্তানের রাজনীতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত এক বছরে এখানে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে তালেবানরা। গত দুইদিনের লড়াইয়ের পর এরইমধ্যে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে হেলমান্দের প্রাদেশিক লস্কর গাঁ শহরের উপকণ্ঠে প্রবেশ করেছেন তালেবান সদস্যরা। রাতভর সেখানে ভারী অস্ত্রের আওয়াজ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শহরে তালেবানের অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেন হেলমান্দের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ কারিম আতাল। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ভালো না। আমরা শহরের বাইরে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছি। তালেবানরা শহরের দুই কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে।
পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ড্রোন হামলায় তালেবান নেতা মোল্লা আখতার মানসুর নিহত হওয়ার পর হেলমান্দ প্রদেশে এসব হামলার ঘটনা ঘটল। তালেবানের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে মোল্লা মানসুর হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।
২৫ মে ২০১৬ তারিখে মোল্লা হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদাকে আফগান তালেবানের নতুন নেতা ঘোষণা করা হয়। এরপরই দেশটির সরকারের সঙ্গে যে কোনও ধরনের শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেন তালেবানে নতুন এই শীর্ষ নেতা। একইসঙ্গে তিনি তার ভাষায় ‘শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই’ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর এক অডিও বার্তায় হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদা ঘোষণা দেন, তিনি সাধারণ জীবনযাপন করবেন। নিয়মিত শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাবেন। সাংগঠনিকভাবে নিজের দুই পূর্বসূরি মোল্লা মানসুর ও মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের নীতির অনুসরণ করবেন।
আফগান তালেবানের শীর্ষ নেতা মোল্লা আখতার মনসুরের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদাকে প্রধান নেতা নির্বাচন করা হয়। ২৫ মে তালেবানের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় নেতারা এক বৈঠকে মিলিত হয়ে মোল্লা হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদাকে নতুন নেতা নির্বাচন করেন।
উচ্চ পর্যায়ের কমান্ডারদেরকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন নবনির্বাচিত তালেবান প্রধান। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন আফগান সরকারের সঙ্গে কোন রকম শান্তি আলোচনায় যাওয়া হবে না। আখন্দজাদা অঙ্গীকার করেছেন, তিনি তালেবানদের মধ্যে মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের যুগ ফিরিয়ে আনবেন এবং নিবেদিতপ্রাণ নেতার মত সাধারণ জীবনযাপন করে শত্রুদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখবেন।
এর আগে বিনা অনুমতিতে নিজ ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালানোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে পাকিস্তান। এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বলেছেন, আফগান তালেবানের সাবেক শীর্ষ নেতা মোল্লা আখতার মনসুর আলোচনার বিরোধী ছিলেন না।
আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানদের আলোচনায় মোল্লা আখতার মনসুর মূল বাধা বলে যে প্রচারণা রয়েছে সংবাদ সম্মেলনে তা নাকচ করে দেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মোল্লা আখতার মনসুর না চাইলে কাবুলের সঙ্গে তালেবানের আলোচনা হতো না।
২১ মে ২০১৬ শনিবার আফগান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় একটি গাড়িতে থাকা মনসুর ও তার এক সহযোগীকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে মোল্লা আখতার মনসুর নিহত হন।
তালেবানের নতুন শীর্ষ নেতার সহযোগী সিরাজুদ্দিন হাক্কানির মাথার দাম হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ লাখ ডলার অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করা আছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, হাক্কানি তালেবানের প্রধান নির্বাচিত হলে আফগান সরকারি বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনীর প্রতি বিদ্রোহীরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
হাক্কানিকে আফগান বিদ্রোহীদের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের কর্মকর্তারা। গত মাসে কাবুলে চালানো হামলাসহ তালেবানের চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর জন্য হাক্কানিকে দায়ী করা হয়। গত এপ্রিলে কাবুল হামলায় ৬৪ জন নিহত হন।
মনসুরের পর হাক্কানির তালেবান প্রধান হওয়ার সম্ভাবনা তাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। তবে হাক্কানির বদলে মোল্লা হাবিবুল্লাহ আখন্দজাদা তালেবানের নতুন নেতা নির্বাচিত হলেও তিনি পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
২০১১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শহর অ্যাবোটাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন অভিযানে আল কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর এটিই পাকিস্তানে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। এই হামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এতে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করে ইসলামাবাদ।
মনসুরের মৃত্যুর পর নতুন নেতা নির্বাচন নিয়ে তালেবানদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেছিলেন কেউ কেউ। তবে এর বিপরীতে বলা হচ্ছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলা মোকাবিলা করে টিকে থেকে তালেবানরা নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে। তাই মনসুরের মৃত্যুর পরও হয়তো গোষ্ঠীটি এই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সময় নেবে না।
২৫ মে নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই রাজধানী কাবুলে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে তালেবান। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও চারজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে দুইজন শিশু।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত ক্ষেত্র তৈরি করেছে তালেবানরা। আফগান সেনাবাহিনীকে তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে তালেবান। সূত্র: আল জাজিরা।
/এমপি/








