‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ভারত আমাদের আত্মপরিচয় আর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে’

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:২৮, আগস্ট ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৩, আগস্ট ১০, ২০১৯

কেবল সেলফোন, ল্যান্ডলাইন আর ইন্টারনেট নয়, ভারত-শাসিত অবরুদ্ধ কাশ্মিরে বন্ধ রাখা হয়েছে ক্যাবল টিভির সংযোগও। ধারণা করা হচ্ছে শহরের বাইরের অনেকেই এখন পর্যন্ত ভারত সরকারের নতুন ঘোষণা শোনেনি। জানতে পারেনি তাদের বিশেষ মর্যাদা আর স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার খবর। মানুষ দেখা করতে পারছে না স্বজনের সঙ্গে, এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সও ডাকতে পারছে না। গণপরিবহন চলছে না, ফলে অসুস্থ হয়ে পড়লে কেবলমাত্র তারাই হাসপাতালে যেতে পারছে, যাদের গাড়ি আছে। শহরজুড়ে বহু রাস্তা স্থায়ীভাবে কাঁটাতার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মিরিরা বলছেন, ভারত সরকার তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। মুছে দিতে চাইছে ‘আত্মপরিচয়’। তাদের মতে, ‘এরচেয়ে মৃত্যুও ভালো’।

গত সপ্তাহে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে বেশিরভাগ মানুষই খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করে রাখে। তবে কারফিউ কত দীর্ঘ হবে কেউই তা জানে না। সব চেকপয়েন্টেই শিশুসহ পরিবার নিয়ে বের হওয়া মানুষেরা তাদের চলাচলের সুযোগ দিতে কর্মকর্তাদের অনুরোধ করছে। শুক্রবার পুলিশের তরফে কারফিউ সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় যাতে করে মানুষ জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যেতে পারে। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর খবর অনুযায়ী নামাজের পরে কিছু বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া শুরু করে মানুষ। আধাসামরিক বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে তার জবাব দেয়।

নামাজ শুরুর আগে ছররা ও রাবার গুলিতে আহত অন্তত ৫০ জনকে শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের বিক্ষোভের পর আরও কতজনের চিকিৎসার প্রয়োজন পড়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তা জানা যায়নি। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সেখানকার পুরো রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। বিক্ষোভ দমনের স্বার্থে শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদের অনেককেই সাময়িক আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কাশ্মিরের সবচেয়ে বড় শহর শ্রীনগরের অনেকেই মূলধারার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে কিছু আশা করেন না আর। নিজের বন্ধ দোকানের বাইরে বসে মীর শহীদ নামে এক দোকানিও বললেন একইরকম কথা। তিনি বলেন, ‘ভারতপন্থী নেতারা কিছুই করবে না আর আমরা তাদের ওপর কোনও আশাও রাখি না।’ বিগত নির্বাচনে খুব সীমিত সংখ্যক ভোট পড়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে আশা করবো যে তারা কাশ্মিরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে। তারা আমাদের নেতা নয়।’

গত সপ্তাহে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে বেশিরভাগ মানুষই খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করে রাখে। তবে কারফিউ কত দীর্ঘ হবে তা কেউই জানে না। সব চেকপয়েন্টেই শিশুসহ পরিবার নিয়ে বের হওয়া মানুষেরা তাদের যেতে দিতে কর্মকর্তাদের অনুরোধ করছে।

২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রিজওয়ান মালিক খুবই ক্ষুব্ধ যে, দশকের পর দশক ধরে যে ৩৭০ ধারার কারণে কাশ্মির বিশেষ ধারার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছে এবং বিশেষ মর্যাদার ভিত্তিতে বাকি ভারতের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে, কাশ্মিরবাসীর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তা বাতিল করা হয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালিক তাদের দলে নয়, যারা কাশ্মিরকে ভারত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চায়। কখনও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েননি তিনি। তবে তার মতে, ভারতের সঙ্গে কাশ্মিরের বিশেষ ধারার সম্পর্কসূত্র ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্পের মধ্যে’ বিলীন করে দিতে চাইছে মোদি সরকার। তার ভাষ্য, ‘ভারত যদি নিজেকে সত্যিই গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তো কাশ্মিরিদের সঙ্গে যা ঘটানো হলো তা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারত আর কাশ্মিরের মধ্যকার সম্পর্কে একটা অস্বস্তি সবসময় রয়ে গেছে, বিশেষ মর্যাদা ছিল ওই অস্বস্তি এড়িয়ে সেতুবন্ধন তৈরির হাতিয়ার। সেই মর্যাদা কেড়ে নিয়ে আমাদের আত্মপরিচয়হীন করে তোলার চেষ্টা চলছে।’  

রিজওয়ানের বোন রুকশার রশিদের বয়স ২০ বছর। কাশ্মিরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন তিনি। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ঘটনার দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা শুনে তার হাত অসাড় হয়ে আসছিল। তার মা কেঁদে উঠেছিল। ‘মা বলছিলেন, এর চেয়ে তো মৃত্যুও ভালো’, জানান রুকশার।  

বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মিরে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, তার সিদ্ধান্তের কারণে রাজ্যের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হবে। তবে কাশ্মিরের অচলাবস্থার অর্থনৈতিক পরিণতি হচ্ছে মারাত্মক। ট্যুর অপারেটর হাফিজ আহমেদ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘গত সপ্তাহে হাজার হাজার পর্যটক ও হিন্দু তীর্থযাত্রীকে কাশ্মির ছেড়ে যেতে বলার ঘটনা অভূতপূর্ব। ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পর এই শিল্পটি কেবল ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া শুরু করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘এখানে যে পর্যটকরা আসেন তারা আমাদের অতিথির চেয়েও বেশি কিছু। আমাদের কাশ্মির এতোটাই অতিথিপরায়ণ যে, আমরা আমাদের সবচেয়ে খারাপ সময়েও তীর্থযাত্রীদের খাবার দিয়ে থাকি। আর তারা সব পর্যটক আর তীর্থযাত্রীদের চলে যেতে বলল। এ এক লজ্জার বিষয়’।

সবার ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে এই অচলাবস্থা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দিতে পারে।

জম্মু-কাশ্মির পিপলস কনফারেন্স-এর মুখপাত্র আদনান আশরাফ বলেন, ‘আমার মতো মানুষ এখন আর ভারতের পার্লামেন্টের ওপর কোনও বিশ্বাস বা প্রত্যাশা রাখতে পারে না। এই সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভারত কাশ্মিরিদের অধিকার ও স্বাধীনতা হরণ করে নিয়েছে। এটা একটা বড় ধরনের ঐতিহাসিক বিপর্যয়।’

/জেজে/বিএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ