কৈশোরে শরীরচর্চায় বাংলাদেশ শীর্ষে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২২:৩৩, নভেম্বর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৬, নভেম্বর ২২, ২০১৯

শারীরিক সক্রিয়তার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে ভালো বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির এক জরিপে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরা শারীরিকভাবে মোটেই সক্রিয় নয়। অর্থাৎ তারা যথেষ্ট পরিমাণে শরীরচর্চা বা খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে না। তবে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সমস্যা বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম। আর এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েদের। সম্প্রতি মোট ১৪৬টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই জরিপে বলা হচ্ছে, কেউ দিনে অন্তত একঘণ্টা শরীরচর্চা বা কোনও ধরনের খেলাধুলায় অংশ না নিলে তাকে ‘শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা’ বলে গণ্য করে। কারণ, যথেষ্ট শরীরচর্চার অভাবে শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা কমছে। বিষয়টা এখন প্রায় মহামারীর রূপ নিয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েরা (৯৭ শতাংশ) ও ফিলিপাইনের ছেলেরা (৯৩ শতাংশ) হচ্ছে শারীরিকভাবে সবচেয়ে নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে এর হার ৬৬ শতাংশ।

এই জরিপে আরও বলা হয়েছে, শিশুদের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার এই সমস্যা আফগানিস্তান থেকে শুরু করে জিম্বাবুয়ে—সবদেশেই কম-বেশি আছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই যথেষ্ট শরীরচর্চা করছে না, খেলাধুলা করছে না। সমস্যাটা ধনী-গরিব সবদেশেই একই রকম। তবে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা একটু বেশি সক্রিয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট ধরে মধ্যম বা বেশি পরিমাণে শরীরচর্চা করা উচিত। এ সংস্থার চিকিৎসক ড. ফিওনা বুল বলেন, ‘এটিকে হাস্যকর লক্ষ্য বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। সুস্বাস্থ্য, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

মাঝারি ও তীব্র মাত্রার শরীরচর্চার মধ্যে তফাৎ হচ্ছে মাঝারি শরীরচর্চার মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায়, দম ফুরিয়ে যায় না। তবে তীব্র শরীরচর্চার সময় শ্বাস-প্রশ্বাস এত দ্রুত নিতে হয় যে তখন কথা বলা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  চিকিৎসক ড. রেজিনা গুটহোল্ড বলেন, ‘কেউ যদি কৈশোরে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকে, এমন সম্ভাবনা প্রবল যে, পরিণত বয়সেও তিনি সক্রিয় থাকবেন। আর কেউ যদি সারাজীবন এরকম সক্রিয় জীবন-যাপন করতে পারেন তাহলে তার হৃদরোগ, টাইপ-টু-ডায়াবেটিস হতে শুরু করে স্ট্রোকের মতো রোগের ঝুঁকি অনেক কমবে।’

শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গেও এই শারীরিক সক্রিয়তার সম্পর্ক আছে বলে দেখতে পাচ্ছেন গবেষকরা।

ড. বুল বলেন, শিশুরা আসলে অলস নয়। এই জরিপ আসলে আমাদের সবার ব্যাপারেই একটা সত্যের দিকে নির্দেশ করছে, এটা কেবল শিশুদের ব্যাপার নয়। আমরা সবাই আসলে এখন শারীরিক তৎপরতাকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হচ্ছি, এটিকে অবহেলা করছি। পুরো দুনিয়াজুড়েই এটা ঘটছে।

কেন আমরা আগের মতো আর শারীরিকভাবে সক্রিয় নই, তার একক কোনও কারণ নেই। এর বহুবিধ কারণ রয়েছে। একটা কারণ হচ্ছে, এখন শিশুদের শারীরিকভাবে ফিট রাখার চাইতে লেখাপড়ায় ভালো করাটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই সমীক্ষায় যুক্ত গবেষক লীন রাইলি বলেন, ‘৭ হতে ১১ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের ওপর পড়াশোনায় ভালো করার জন্য বেশ চাপ থাকে, পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তাদের উৎসাহিত করা হয়। প্রায়শই তারা দিনের একটা দীর্ঘ সময় স্কুলে বসে কাটাচ্ছে, হোমওয়ার্ক করছে। শারীরিকভাবে যথেষ্ট সক্রিয় থাকার কোনও সুযোগ তারা পাচ্ছে না।’

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে খেলাধুলা এবং অন্যান্য অবসর বিনোদন কার্যক্রমের সুবিধার অভাব। এগুলোতে সবার সমান সুযোগ নেই। নিরাপত্তার সমস্যাও আছে। রাস্তাঘাট যেহেতু নিরাপদ নয়, তাই সেখানে সাইকেল চালানো, হেঁটে কোনও বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া, এগুলোও আর সেভাবে হয় না। আরেকটা বড় কারণ ডিজিটাল বিপ্লব। ফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারে এখন ডিজিটাল গেম খেলার সুযোগ এত বেশি যে বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করার চেয়ে এটা বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

ড. বুলের মতে, ‘এখন নানা রকম বিনোদনের যে বিপুল সুযোগ-সুবিধা, তা অভূতপূর্ব। আগের কোন প্রজন্মের সঙ্গে এর তুলনাই চলে না।’

জরিপে বলা হচ্ছে, শরীরচর্চায় মেয়েরাও পিছিয়ে ছেলেদের তুলনায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সবদেশেই সমস্যাটা একই রকম। বাংলাদেশের অবস্থান যদিও সূচকে বেশ ভালো, তারপরও সেদেশেও ৬৬ শতাংশ শিশু প্রতিদিন এক ঘণ্টা যে শরীরচর্চা বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার কথা, সেটা করছে না। ফিলিপাইন আর দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। যুক্তরাজ্যে ৭৫ শতাংশ ছেলে এবং ৮৫ শতাংশ মেয়ে শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, অর্থাৎ তারা দিনে এক ঘন্টা ব্যায়াম করছে না।

কানাডার ইস্টার্ন অন্টারিও শিশু হাসপাতালের ড. মার্ক ট্রেম্বলে বলছেন, ‘ইলেকট্রনিক বিপ্লব মানুষের শারীরিক নড়াচড়ার ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। মানুষ এখন কোথায় কীভাবে থাকে, কীভাবে শেখে, কাজ করে, খেলে, বেড়াতে যায়—এই সব কিছুই বদলে গেছে। এখন মানুষ আরও বেশি করে ঘরে বন্দি হয়ে গেছে। তাদের বেশিরভাগ সময় কাটছে চেয়ারে। মানুষ ঘুমাচ্ছে কম, বসে থাকছে বেশি, হাঁটছে অনেক কম, গাড়ি চালাচ্ছে অনেক বেশি। আগের তুলনায় শারীরিক তৎপরতা কমে গেছে অনেক।’

রয়্যাল কলেজ অব পেডিয়াট্রিক্স অ্যান্ড চাইল্ড হেলথের অধ্যাপক রাসেল ভাইনার বলেন, ‘এই গবেষণার ফল খুবই উদ্বেগজনক। যেসব শিশু শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয় তাদের স্বাস্থ্য ভালো। স্কুলেও তারা অনেক বেশি ভালো করছে। আমাদের উচিত শিশু ও তরুণরা যেন আরও বেশি শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকে।  স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপন করে, আমাদের সেটা নিশ্চিত করা উচিত। তবে এটা বলা যত সহজ, করা ততটাই কঠিন। সূত্র: বিবিসি 

/এইচকে/

লাইভ

টপ