দুর্ঘটনা হলেও বৈরুত বিস্ফোরণে আলোচনায় হিজবুল্লাহ

দুর্ঘটনা হলেও বৈরুত বিস্ফোরণে আলোচনায় হিজবুল্লাহ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৪৬, আগস্ট ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫২, আগস্ট ০৫, ২০২০

লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দর মঙ্গলবার ভয়াবহ সিরিজ বিস্ফোরণে ধোঁয়ার কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। বিস্ফোরণ এতই শক্তিশালী ছিল যে ২৪০ কিলোমিটার দূরে সাইপ্রাস থেকেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। শতাধিক প্রাণহাণি, তিন সহস্রাধিক আহত এবং তিন লক্ষাধিক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে নির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে লেবানন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বিস্ফোরণ দুর্ঘটনার কারণে হয়ে থাকতে পারে। দুর্ঘটনা মনে করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে ইরান সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ -এর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফ্ক্স নিউজ একাধিক সূত্রের কথা উল্লেখ করে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বন্দরে হিজবুল্লাহর ‘অঘোষিত’ নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দরে বিস্ফোরকের একটি ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে।

একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বন্দরে সংগঠিত অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব চক্র হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত। বিস্ফোরণে একাধিক কন্টেইনারের সম্ভাব্য সংশ্লষ্টতা থাকলেও সেগুলো সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত না।

বিস্ফোরণের পর নিন্দা জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার জন্য হিজবুল্লাহ মেডিক্যাল টিম মোতায়েন করেছে এবং সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, আতশবাজি, পেট্রোল ও আগ্নেয়াস্ত্র একসঙ্গে মজুদ রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি তথ্য মতে বিস্ফোরণ ঘটেছে আতশবাজি ও পেট্রোলের গুদামে।

সূত্রটি বিস্ফোরণের ভিডিও পর্যালোচনার কথা তুলে জানায়, বড় বিস্ফোরণে আগে একটি ছোট বিস্ফোরণ ঘটেছে। রঙের পার্থক্যও নির্দেশ করে বিস্ফোরণে আতশবাজির ভূমিকা। তবে সম্ভাব্য আগ্নেয়াস্ত্র ও অন্যান্য দ্রব্য মজুদ রাখার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কানাডাভিত্তিক প্রতিরক্ষা পরামর্শক সংস্থা টেরা নোভা স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্টের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্র্যাডবারি জানান, বিধ্বস্ত বন্দরটি লেবাননের প্রধান পণ্য পরিবহন কেন্দ্র। এটি পরিচালনা করে গেসশন এট এক্সপ্লয়টেশন ডু পোর্ট ডি বেইরুথ বা জিইপিবি। বন্দরের কন্টেইনার কার্যক্রম সাব কন্ট্রাক্টে পরিচালনা করে বৈরুত কন্টেইনার টার্মিনাল কনসোর্টিয়াম। ভূমাধ্যসাগরে এই বন্দর সবচেয়ে বড় ও সক্রিয়।

ইয়ান ব্র্যাডবারি বলেন, আতশবাজি আমদানি স্বাভাবিক ঘটনা। ভিডিওতে বিস্ফোরণ যে এলাকায় ঘটেছে সেখানে এমন পণ্য মজুদ রাখার জন্য পরিচিত। তবে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, বন্দরের বিস্ফোরণস্থলে আগের অস্ত্রের চালান গ্রহণ করা হয়েছে বা মজুদ রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

লেবাননের গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট অব জেনারেল সিকিউরিটির প্রধান মেজর জেনারেল আব্বাস ইব্রাহিম বিস্ফোরণের পর এক তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের প্রাথমিক উৎস ছিল একটি কন্টেইনার। যাতে ‘উচ্চমানের বিস্ফোরক দ্রব্য’ লেখা ছিল। এর মধ্যে সোডিয়াম নাইট্রেট থাকতে পারে। এর ফলে আতশবাজির কারণেই এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে বলাটা খুবই সাদাসিধে কথা।

বিস্ফোরণের কারণ যাই হোক না কেন, এর ফলে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী আবারও আলোচনার মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস ধরে লেবানন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শুধু যে অঞ্চলটির ইয়েমেন থেকে সিরিয়া বা ইরাকে ইরান সমর্থিত কর্মকাণ্ডের জন্য তা নয়, নিজ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণেও।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স ডেমোক্র্যাসিস (এফডিডি)-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাথন শেনজার বলেন, এই মুহূর্তে লেবাননে বিস্ফোরণ সামরিক হামলার ফল ছিল না বলে ধারণা করা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে নির্বুদ্ধিতার কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু চলমান উত্তেজনা স্পষ্ট করছে ভবিষ্যতের বিস্ফোরণ হতে পারে আরও বেশি পরিকল্পিত। লেবাননের দুঃসময়ে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সন্ত্রাসদমন কর্মকর্তা ও হোয়াইট মাউন্টেইন গবেষণা সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এয়ারফোর্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) রুডলফ আটাল্লাহ মনে করিয়ে দিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতাসহ আকাশছোঁয়া উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

রুডলফ আটাল্লাহ বলেন, মানুষ দেখছে যে করোনাভাইরাসের কারণে আসা খাদ্য ও ত্রাণ সহযোগিতা কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে বা সিরিয়া নিয়ে যাচ্ছে হিজবুল্লাহ। কারণে তাদের সেখানে বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে। এছাড়া বিস্ফোরণের পর গুজব ছড়াচ্ছে খুব দ্রুত। লোকজন ক্ষুদে বার্তা পাঠাচ্ছে ঘরে থাকার জন্য। হিজবুল্লাহ প্রতিবাদ চায় না এবং তারা চায় না লেবাননের লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলুক।

লন্ডনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভির এক সাংবাদিক তাজুদ্দিন সরুশ ফক্স নিউজকে বলেছেন, কাতায়েব হিজবুল্লাহর শীর্ষসারির এক নেতা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে। ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটির নিহত নেতা ইরাকে চরম সহিংসতার জন্য পরিচিত।

বৈরুতের বিস্ফোরণে ইসরায়েলের জড়িত থাকার কথাও ছড়িয়েছে ইন্টারনেটে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহ মধ্যকার এই সপ্তাহের আন্তঃসীমান্ত বিরোধের কারণে এই গুজব শক্তি পায়। তবে একাধিক ইসরায়েলি কর্মকর্তা এই বিস্ফোরণে দেশটির জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

 

 

/এএ/

লাইভ

টপ