ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের একাংশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমতে শুরু করায় মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে বাড়ছে মহামারির প্রকোপ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাতিন আমেরিকার সংক্রমণের পরিমাণ চূড়ায় পৌঁছাতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। এদিকে যেসব দেশ সংক্রমণ বিস্তার রোধ করতে পেরেছিল এবং বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল তারাও এখন দ্বিতীয় দফা প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
শুক্রবার জেনেভা-র সদর দফতর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দুনিয়াজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি একটি নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শনিবার হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়া তাদের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে: করোনাভাইরাসের সবথেকে বাজে পরিস্থিতি এখনও আসেনি।
হাফিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির এপিসেন্টারে পরিণত হয়েছে লাতিন আমেরিকা। প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক কারিসা এটিয়েন জানিয়েছেন, বিশেষ করে ব্রাজিলের অবস্থা চরম উদ্বেগের। দশ লাখের বেশি আক্রান্ত নিয়ে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের শিকার দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। ব্রাজিলের চেয়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেশি একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের।
লাতিন আমেরিকার আক্রান্ত ৪০ লাখ আর মৃত্যুর শিকারদের এক চতুর্থাংশই ব্রাজিলের। সংক্রমণের হার দ্রুতই বাড়ছে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কোভিড-১৯ ব্রাজিল গ্রুপের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বে নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে ব্রাজিলের সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ।
এই গ্রুপের সদস্য ডমিনগোজ আলভেস বলেন, আমরাই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে শনাক্ত ও মৃত্যু লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যা এক্সিলারেটরে পা দিয়ে রেখেছে।
সম্প্রতি সবচেয়ে বড় মেট্রোপলিটন এলাকা সাও পাওলোতে কর্তৃপক্ষ গণকবর খোড়ার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। করোনায় মৃতদের রাখতে বড় লোহার কন্টেইনারের চাহিদা বাড়ছে।
ব্রাজিলের পরিস্থিতির সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সব সময়েই কঠিন। বিশেষ করে যেসব রোগীর পরীক্ষা করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লাখ মানুষে পরীক্ষার হার ৩৭ হাজার ১৮৮। ব্রাজিলে তা মাত্র ৮ হাজার ৭৩৭। এছাড়া ব্রাজিল সরকারের বিরুদ্ধে মহামারির তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এই মাসের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনার তথ্য প্রকাশের একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করলে এই অভিযোগ উঠে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো শুরু থেকেই মহামারির বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে খাটো করে দেখে আসছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন সামরিক কর্মকর্তাদেরকে। যুক্তি হাজির করেছেন লকডাউনের বিরুদ্ধে। সবমিলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে দেশটির জনস্বাস্থ্য সেবা।
আরও বেশ কিছু দেশ করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও লকডাউন ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে।
জুন মাসে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডোর বলেছেন, আমাদের নতুন স্বাভাবিকতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে, কারণ জাতীয় অর্থনীতি ও জনগণের কল্যাণ এর উপর নির্ভরশীল।
বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুন ৫ হাজার ৬৬২ জন করোনায় আক্রান্তকে শনাক্ত ও আরও ৬৬৭ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৫ ও মৃতের সংখ্যা ১৯ হাজার ৭৪৭ জনে পৌঁছেছে। সরকার বলছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
ভারতেও দেশজুড়ে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে নতুন আক্রান্তের বৃদ্ধির পরও। বৃহস্পতিবার ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুন শনাক্তের রেকর্ডের কথা জানিয়েছে। দেশটিতে এখন মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। দিল্লিতে হাসপাতালে রোগীর জন্য বেড নেই। জায়গা না থাকায় অনেক রোগীকেই হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মানদীপ সিং লিখেছেন, ১ জুন আমার শ্বশুরের করোনা পজিটিভ হওয়ার রিপোর্ট পাই। এরপর আমাদের অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয়। প্রতিশ্রুতি দিলেও গঙ্গারাম হাসপাতালের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ রিসিভ করেনি। হতাশা নিয়ে করোনা রোগীদের ভর্তি করছে এমন হাসপাতালের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। আমরা ম্যাক্স, অ্যাপোলো, এআইআইএমএস, সাফডুর্জ– সব হাসপাতাল থেকেই আমাদের বলা হয়েছে, বেড নাই।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীরা বারান্দায় চিকিৎসাহীন পড়ে আছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর মৃতদেহ পড়ে থাকায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।
রবিবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, নয়া দিল্লি শহর কর্তৃপক্ষকে ৫০০ টি রেলওয়ের বগি দেবে। করোনা রোগীদের চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকবে এগুলোতে। হাসপাতালে বেড সংকটের সমাধানে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ভারতে করোনার সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে নভেম্বরে। ওই সময় দেশটিতে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ বেডের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
দিল্লির ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টির এক আইনপ্রণেতা বলেন, আমি মনে করি সংক্রমণ এতো বেশি হবে বলে আমাদের ধারণা ছিল না।








