কলকাতার পূজামণ্ডপে সৃজনশীলতার উৎসব

রক্তিম দাশ, কলকাতা
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০০:৪৮আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০০:৪৮

কলকাতার দুর্গাপূজা মানেই এখন শুধু দেবী দর্শন নয়, বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসব। এক সময় যেখানে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা, আচার-অনুষ্ঠান আর ধূপধুনোই ছিল কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে আজ থিম-ভিত্তিক মণ্ডপই আকর্ষণের মূল কেন্দ্র। সারা শহরজুড়ে প্রতিটি মণ্ডপ যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে- কে সবচেয়ে অভিনব ভাবনা আনতে পারে, কে দর্শকদের চমক দিতে পারে নতুন আইডিয়ায়।

নব্বইয়ের দশকে কলকাতার দুর্গাপূজায় থিমের হাতেখড়ি। তার আগে বেশিরভাগ মণ্ডপই ছিল শোলা, কাপড় কিংবা বাঁশের ঐতিহ্যবাহী সজ্জায় ভরপুর। কিন্তু ১৯৯০-এর পর থেকে কিছু ক্লাব সাহস করে আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করে। সেই শুরু থেকে আজ থিম পূজা এক বিশাল শিল্প-অভিযান। এখন প্রায় প্রতিটি বড় পূজা কমিটি থিম নির্ভর।

কলকাতার পূজা থিমে নানা রঙের ছোঁয়া দেখা যায়। লোকসংস্কৃতি- বাংলার লোককলা, পটচিত্র, ডোকরা শিল্প বা বাউল গানের প্রভাব। আন্তর্জাতিক- মিশরের পিরামিড, গ্রিসের মন্দির বা জাপানি সংস্কৃতির অনুপ্রেরণা। সামাজিক বার্তা- পরিবেশ রক্ষা, নারীশক্তি, শিক্ষা, প্রতিবন্ধীদের অধিকার। আধুনিক শিল্পকলা- বিমূর্ত ভাস্কর্য, ইনস্টলেশন আর্ট কিংবা রঙ-বাতির খেলা।

কলকাতার পূজামণ্ডপে সৃজনশীলতার উৎসব

কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, দেশপ্রিয় পার্ক, সুরুচি সংঘ, বাদামতলা আষাড়সঙ্গীনি, কলেজ স্কোয়ার, কাশীপুর তরুণ সংঘ- এই নামগুলো এখন প্রায় কিংবদন্তি। প্রতিবারই নতুন থিম নিয়ে হাজির হয় এরা। যেমন- একবার কোথাও পুরো মণ্ডপ বানানো হয়েছে মাটির হাঁড়ি দিয়ে। আবার কোথাও হাজারো কাঠের চামচ দিয়ে প্রতিমার আসন সাজানো হয়েছে। কোনো জায়গায় প্যান্ডেলই রূপ নিয়েছে বিশাল জাহাজের।

দুর্গাপূজার থিম নিয়ে গড়ে ওঠেছে কয়েকশ কোটি রুপির শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি। শিল্পী, কারিগর, লাইটিং ডিজাইনার, রঙকর্মী, বাঁশ-মাটির মিস্ত্রি—সবাই যুক্ত হন এই কর্মযজ্ঞে। অনেকে সারা বছর অপেক্ষা করেন এই কয়েক মাসের জন্য, যখন তাদের সৃজনশীলতা মণ্ডপে ফুটে ওঠে। ২০২১ সালে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই স্বীকৃতি আরও এক ধাপ বাড়িয়েছে পূজার গৌরব, বিশেষ করে থিম নির্ভর মণ্ডপগুলোকে।

কলকাতার পূজামণ্ডপে সৃজনশীলতার উৎসব

তাই কলকাতার দুর্গাপূজা মানেই এখন কেবল দেবী দর্শন নয়, এক অনন্য শিল্পযজ্ঞ। এ বছরও শহরের বড় বড় পূজা কমিটিগুলো অভিনব থিমে সাজিয়েছে তাদের মণ্ডপ। কাঠ, আলো, আয়না, ফাইবার, এমনকি প্লাস্টিক বোতল- সবকিছু দিয়েই গড়ে ওঠেছে একেকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম। দেশপ্রেম থেকে সিনেমা, মন্দির থেকে লোকজ- সবই এখন এক ছাদের নিচে।

মধ্য কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার-এ এবারের থিম ‘অপারেশন সিঁদুর’। সেনাদের সাহসিকতা আর শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতে গোটা মণ্ডপ গড়া হয়েছে সেনা ছাউনির মতো। লাল-কমলা আলোয় প্রতিমার চারপাশ যেন যুদ্ধক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে শান্তির প্রতীক। অন্যদিকে উত্তর সিমলা স্পোর্টিং ক্লাব-এ দর্শকরা ঢুকেই ফিরে যাচ্ছেন বলিউডের কালজয়ী ছবির জগতে। থিম ‘শোলে’—মাটির ঘর, পাহাড়ি প্রান্তর আর গব্বরের আস্তানার প্রতিরূপে দর্শক যেন সিনেমার অংশ হয়ে যাচ্ছেন।

মন্দিরের গাম্ভীর্য থেকে গ্রামীণ বাংলাও থিমে। শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব এবার তুলে এনেছে বিদেশের ছোঁয়া। নিউ জার্সির স্বামিনারায়ণ মন্দিরের আদলে মণ্ডপ, যেখানে সূক্ষ্ম খোদাই করা স্তম্ভ আর সাদা-সোনালি আলোয় যেন সত্যিই দর্শক পৌঁছে গেছেন বিদেশি মন্দিরে। অন্যদিকে দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্থান পার্ক বেছে নিয়েছে থিম ‘লোকজ’। মাটির ঘর, খড়ের চাল, লণ্ঠনের আলো—সব মিলিয়ে এ মণ্ডপ গ্রামীণ বাংলার গন্ধে ভরপুর। প্রতিটি কোণে লোকশিল্পের প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করছে।

বোতলে তৈরি কারাগার, বীজের আঙিনায় কৃষির বার্তাও রয়েছে থিমে। লালাবাগান নবাঙ্কুর-এর থিম ‘কারাগার’। প্রায় পাঁচ লাখ প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তৈরি হয়েছে পুরো জেলখানা। অন্ধকার করিডরে ঢুকতেই দর্শকদের মনে হচ্ছে সত্যিই যেন বন্দিশালায় রয়েছেন। অন্যদিকে টানা প্রত্যয়-এর থিম ‘বীজ আঙিন’। শস্য, বীজ, ডাল দিয়ে সাজানো মণ্ডপে ফুটে উঠেছে কৃষকের জীবন, প্রকৃতির সুরক্ষা আর খাদ্য নিরাপত্তার বার্তা।

কলকাতার পূজামণ্ডপে সৃজনশীলতার উৎসব

আয়নার প্রতিচ্ছবি থেকে শূন্য পৃথিবীর মন্ডপ এবার কলকাতায়। অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাব-এ থিম ‘মুখোমুখি’। আয়না, প্রতিফলন আর লেজার আলোয় তৈরি হয়েছে এক ভবিষ্যতবাদী পরিবেশ। দর্শক ঢুকেই নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে মুখোমুখি হচ্ছেন। অন্যদিকে বরিশা ক্লাব-এ এবারের থিম ‘শূন্য পৃথিবী’। সাদা-নীল আলো, ফাঁকা কাঠামো, সার্কাসের মতো আবহ- সব মিলিয়ে মানুষকে ভাবতে বাধ্য করছে সভ্যতার নিঃসঙ্গতা নিয়ে।

আবার রহস্যের আবহে বাঙালির গোয়েন্দা চরিত্র বোমকেশও হাজির। দমদম পার্ক তরুণ সংঘ তুলে ধরেছে বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র বিয়োমকেশ বক্সীকে। পুরনো কলকাতার বাড়ি, লণ্ঠনের আলো, তদন্তের সূত্র- সব মিলিয়ে গোটা মণ্ডপ যেন রহস্যের এক অদ্ভুত জগৎ।

কলকাতার এবারের দুর্গাপূজা আবারও প্রমাণ করলো- এই উৎসব কেবল ধর্মীয় নয় বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী। দেশপ্রেম, লোকজ ঐতিহ্য, পরিবেশ, সিনেমা, রহস্য—সবকিছু মিলেমিশে শহরের প্রতিটি পূজামণ্ডপ হয়ে উঠেছে অনন্য শিল্পকর্ম। কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে এ বছরও কলকাতা প্রমাণ করল, দুর্গাপূজা মানেই বিশ্বমানের শিল্পের মহোৎসব।

/এমএইচআর/
সম্পর্কিত
সব কমিটি বাতিল, ভাঙছে কি মমতার তৃণমূল
ইউনিয়ন কক্ষে কোটি টাকা, ক্যাম্পাসে শয়নকক্ষ; কলকাতার কলেজে তোলপাড়
অভিষেকের ওপর হামলার ঘটনায় বিজেপিকে নিশানা মমতার
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম