বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা পানামা পেপারস ফাঁসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। বিভিন্ন দেশের গোপন নথি ফাঁসকারী প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস এর দাবি- এই ফাঁসের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালিকায় কোনও উল্লেখযোগ্য মার্কিনি না থাকার বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া ফাঁস হওয়া সব তথ্য অনলাইনে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন উইকিলিকসসহ অনেকে। তবে ‘স্পর্শকাতর’ তথ্য প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় সব প্রকাশ করবে না বলে জানিয়েছে আইসিআইজি। বিতর্ক ওঠেছে ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ নিয়েও।
বুধবার মাইক্রো ব্লগিং সাইট টুইটারে উইকিলিকস দাবি করেছে, রাশিয়া ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আক্রমণ করার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এ তথ্য ফাঁস ঘটিয়েছে। উইকিলিকসের দাবি, অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি)-ই পানামা পেপারস ফাঁসের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে লক্ষ্য করেই এই ফাঁস করা হয়েছে। পুতিনকে লক্ষ্য করে চালানো এ ফাঁসের পেছনে অর্থের যোগান দিয়েছে ইউএসএইড (ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) ও যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের জর্জ সরস।
আরেকটি টুইটে উইকিলিকস আইসিআইজির উদ্দেশে বলেছে, যদি ৯৯ শতাংশ তথ্য গোপন রাখা হয় তাহলে সংজ্ঞা অনুসারে আপনারা মাত্র ১ শতাংশ সাংবাদিকতা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের আক্রমণের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিজেদের সততাকে গুরুতরভাবে ধুলিস্যাৎ করেছে বলেও দাবি করে উইকিলিকস।
জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের প্রতিষ্ঠিত উইকিলিকস গত সোমবার টুইটারে একটি জরিপ শুরু করেছে। এতে জানতে চাওয়া হয়েছে, উইকিলিকসের মতো পানামা পেপারসের সব তথ্য প্রকাশ করা দরকার কিনা।
তবে আইসিআইজির প্রধান গেরার্ড রাইল জানিয়েছেন, তারা সব তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করবেন না। এটা করা হলে বেসরকারি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা উইকিলিকস নই। আমরা দেখাতে চাইছি কিভাবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা যায়।
তবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিষয়ে আইসিআইজির মন্তব্য মানতে রাজি নন উইকিলিকসের মুখপাত্র ও আইসল্যান্ডের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্রিস্টিন ফ্রাফেনসন। তিনি ফাঁস করা সব নথি অনলাইনে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন যেন সবাই তথ্য খুঁজতে পারে। তিনি জানান, ফাঁস হওয়া নথি চেপে রাখাকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হিসেবে দেখা কঠিন হবে। ফ্রাফেনসন বলেন, শুধু কয়েকজন সাংবাদিক সরাসরি তা পর্যালোচনা করতে পারবে এমন নয়, ফাঁস হওয়া তথ্য সর্ব সাধারণের পাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
পুরো তথ্য প্রকাশ না করায় ফাঁস তথ্যের সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
আইসল্যান্ডের সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আফশিন রাট্টানসি জানান, তারা যখন বলে এটা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, আমি তাদের এই বলার ধরনের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি।
রাশিয়ান সংবাদমাধ্যম আরটি ডট কমের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন ধনকুবের জর্জ সরসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে রাশিয়াতে অবাঞ্চিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গত বছর রাশিয়ার প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় সরুসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন এবং ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউ অ্যাসিস্ট্যান্স ফাউন্ডেশনকে দেশটিতে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে রাশিয়ার নাগরিক ও সংস্থার অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ওই সময় প্রসিকিউটর কার্যালয় জানায়, ইনস্টিটিউট ও এর অ্যাসিস্ট্যান্স ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম রাশিয়ার সংবিধান ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ বছরের শুরুতে ধনকুবের সরস অভিযোগ করেন, পুতিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ নেতাদের বন্ধু নন এবং ইউরোপকে ভাগ করে অর্থনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করছেন।
জার্মান সাংবাদিক ও লেখক আর্নেন্ট উলফ জানান, বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন সরকারের। সেই অস্থিতিশীলতার জন্যই এই ফাঁস করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রচুর মানুষ তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আরও প্রচুর অর্থ ট্যাক্স হ্যাভেন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথে। যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা চায় বিশ্বের অর্থ যেন অন্য দেশের ভল্টে না থাকে, সব অর্থ যেন তাদের ভল্টে থাকে।
সোমবার ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজি) জানায়, পুতিনকে আক্রমণ করে পানামা পেপারস ফাঁস করা হয়নি। এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে বিদেশে কর ফাঁকি দিয়ে গোপনে বিনিয়োগ করা হয় তা প্রকাশ করা। আইসিআইজি প্রধান গেরার্ড রাইল বলেছিলেন, এটা রাশিয়াকে নিয়ে কোনও ঘটনা নয়। এটা গোপনে অন্য দেশে বিনিয়োগের বিষয়।
তবে তার এ বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হয়। ভ্লাদিমির পুতিন ও তার পরিবারের কোনও সদস্য বিদেশে গোপনে অর্থ বিনিয়োগে জড়িত না থাকলেও তার ছবি দিয়েই খবরটি প্রকাশ করে।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা রে ম্যাকগোভার্ন বলেছেন, আমাদের কটাক্ষ রয়েছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমের মানের ঘাটতি রয়েছে এবং যারা ফাঁস করেছে তাদের সবচেয়ে ভুল ছিল কর্পোরেট মিডিয়ার কাছে তা সরবরাহ করা। বিষয়টি গুরুতর না হলে হাসির উদ্রেক করত।
এসব ফাঁসের ঘটনায় রাশিয়াবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনে মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, পুতিনভীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাশিয়া সম্পর্কে ভালো কিছু অথবা সাফল্য সম্পর্কে বলা এখন অসম্ভব। এখন রাশিয়াকে নিয়ে শুধু নেতিবাচক কথাই বলা যায় যত বেশি ততো ভালো। যখন কিছুই বলার থাকে না তখন কিছু একটা বানিয়ে নিতে হয়।
পানামা পেপারসকে সুযোগ নয় শতাব্দির ফ্লপ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জার্মান সাংবাদিক জেনস বার্জার। তিনি লিখেছেন, পানামা পেপারসে ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৮টি অফশোর কোম্পানির ১১.৫ মিলিয়ন তথ্য রয়েছে। এসব কোম্পানি পরিচালনায় রয়েছেন ১৪ হাজার মানুষ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এদের কাউকেই আদালতে হাজির হতে হবে না। এটার যথার্থ কারণও রয়েছে। কারণ প্রথমত মোসাক ফনসেকার সেবা বেআইনি নয়।
সৌদি আরবের রাজা সালমান আল সাউদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ফাঁস হওয়া তথ্য আসলে গুরুত্বহীন। তার মতে, সৌদি আরবের রাজা সালমান আল সাউদ নিজেই রাষ্ট্র। সৌদি আরবের আইনের ঊর্ধ্বে তিনি। সৌদি আরবের কোনও আইন তার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। তাই তিনি কিভাবে কর ফাঁকি দেবেন? তাহলে জার্মান পত্রিকা কেন এ খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপছে যে সৌদি রাজার কোম্পানি ভার্জিন আইল্যান্ডে একটি কোম্পানির মালিক?
তিনিও প্রশ্ন তুলেছেন, কেন উল্লেখযোগ্য কোনও মার্কিন নাগরিক তালিকায় নেই, কেন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এবং জার্মান পত্রিকা পুতিনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে, কেন সব খসড়া তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
আইসিআইজির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, অফশোর লিকস, লুক্সেমবার্গ লিকস ও সুইস লিকসের ক্ষেত্রে এসব গণমাধ্যম ও আইসিআইজি বিরাট কিছু করতে পারেনি। সবক্ষেত্রেই দোষীরা রক্ষা পেয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মোস্যাক ফনসেকার প্রায় ১১ মিলিয়ন নথিপত্র ফাঁস হয়। আর এরপরই বের হয়ে আসে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাধরদের অর্থ কেলেঙ্কারির ভয়াবহ তথ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত কিভাবে কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদ গোপন করেন এবং কিভাবে অর্থ পাচার করেন; তা উন্মোচিত হয়েছে নথিগুলো ফাঁস হওয়ার পর। মোস্যাক ফনসেকা নামক আইনি প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার মাধ্যমে মক্কেলদের বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে তারা সম্পদ গোপন এবং কর ফাঁকি দিয়ে ওই অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ উপায়ে ব্যবহারের সুযোগ পান। সূত্র: ডয়চে ভেল, আরটি ডট কম, নেটটাইম ডট ওআরজি।
/এএইচ/








