প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে কী করবেন কিয়ার স্টারমার?

মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬

কিয়ার স্টারমারের ব্যক্তিগত ও নৈতিক সততা নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন নেই। প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতা ও অসংখ্য ইস্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি টিকে ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু দৃশ্যমান কাজও করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার পর তিনি কী করবেন—তা নিয়েই মানুষের আগ্রহ।

স্টারমারের এক রাজনৈতিক সহযোগী গণমাধ্যমকে আভাস দিয়েছেন, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী হয়তো এবার কিছু পাহাড়ে চড়বেন। রূপক অর্থে নয়, সত্যিকার অর্থেই পাহাড়ে। কারণ গত দুই বছরে রাজনৈতিক জীবনে পাহাড়সম বাধা তিনি আগেই অতিক্রম করেছেন। তবে তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি স্টারমার।

তার এক বন্ধু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য তিনি কিছুটা সময় নেবেন। নিজের অগ্রাধিকার কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নন।’ দূরদর্শিতা বা সুস্পষ্ট ভিশনের অভাব রয়েছে; স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই এমন সমালোচনা ছিল। তাই তার এই সিদ্ধান্তহীনতায় অনেকে সেই পুরোনো সমালোচনারই প্রতিফলন দেখতে পারেন।

তবে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা অধিকাংশ মানুষের ধারণা, শেষ পর্যন্ত স্টারমার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই কোনো বড় দায়িত্ব নেবেন। বিশ্বনেতাদের কাছে তিনি যথেষ্ট সমাদৃত। সাধারণ ভোটারদের কাছেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার ভূমিকা ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়িত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে অতিরিক্ত বিদেশ সফরের কারণে তাকে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। বিরোধীরা তার নামই দিয়েছিলেন ‘নেভার হেয়ার কিয়ার’; অর্থাৎ তিনি কখনোই দেশে থাকেন না। অবশ্য স্টারমারের যুক্তি ছিল, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয় একে অপরের পরিপূরক; একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ে।

স্টারমারের এক বন্ধু বলেন, ‘বিশ্বমঞ্চে অবদান রাখার মতো তার অসাধারণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মনে হচ্ছে, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কোনো দায়িত্বই বেছে নেবেন। এটাই তার সবচেয়ে পরিচিত ক্ষেত্র, আর এই কাজেই তিনি সবচেয়ে দক্ষ।’ শোনা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে ন্যাটোর মহাসচিবের পদ শূন্য হলে সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারেও তার আগ্রহ রয়েছে।

আপাতত ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়ার পর স্টারমার ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে সাধারণ এমপির আসনে ফিরছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের সূত্রগুলো বলছে, আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তার সব বন্ধু এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। একজন বলেন, ‘এসব নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবকাশ তিনি এখনো পাননি। তাই শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা বলা কঠিন।’

অনেকে মনে করেন, দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন; তা নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের প্রতি হোক, দলের প্রতি হোক কিংবা দেশের প্রতি। মধ্য লন্ডনের তার আসনের স্থানীয় দলীয় কর্মীরা ইতোমধ্যে তাকে এমপি হিসেবে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে সেখানে উপনির্বাচন না হয়। কারণ উপনির্বাচনে গ্রিন পার্টির জয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে প্রতিটি বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকেই ভাবতে হয়, উত্তরসূরির জন্য তিনি কী ধরনের ভূমিকা রাখবেন। স্টারমারের সহযোগীরা বলছেন, তিনি সাধারণত আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। তাদের একজন জানান, টনি ব্লেয়ারের মতো প্রকাশ্যে মন্তব্য করার বদলে স্টারমার তার উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহামকে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের প্রসঙ্গ টেনে এক সহযোগী বলেন, ‘তিনি (ব্লেয়ার) ছিলেন এক বিরাট অস্বস্তির কারণ। এটি কিয়ারের চেয়ে টনির স্বভাবকেই বেশি প্রকাশ করে।’ আরেকজন বলেন, ‘সবদিক থেকেই স্টারমার টনি ব্লেয়ারের চেয়ে গর্ডন ব্রাউনের ঘরানার কাছাকাছি। বিদায়ের পর তিনি লাখ লাখ টাকা আয়ের পথে হাঁটবেন; এমনটা মনে হয় না। বরং নিজের পছন্দের কোনো বিষয় নিয়েই কাজ করে যাবেন।’

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিটি সুযোগেই স্টারমার তার সরকারের অর্জনের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেছেন। তবে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা ‘লেগেসি’ সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন?

এ সপ্তাহে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, জেরেমি করবিন-পরবর্তী সময়ে লেবার পার্টিকে ধ্বংসের হাত থেকে ‘রক্ষাকারী ব্যক্তি’ হিসেবেই হয়তো মানুষ তাকে মনে রাখবে।

করবিন-পরবর্তী সময়ে দলের পুনর্গঠন প্রসঙ্গে স্টারমার বলেন, ‘এই যাত্রায় প্রতিটি বাঁকে মানুষ আমাকে বলেছে; এটা অসম্ভব, আপনি পারবেন না, এটা কখনোই হবে না। কিন্তু আমি প্রতিবারই বলেছি, অবশ্যই সম্ভব। আপনারা আমাকে তা করতে দেখেছেন। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি এবং সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছি। এই অর্জনের জন্য আমি ভীষণ গর্বিত। তাই ডাউনিং স্ট্রিট থেকে আমি গর্ব নিয়েই বিদায় নেব।’

দল যে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তা তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করলেও, তার বন্ধুরা মনে করেন, ক্ষমতা হারানোর বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি তাকে স্পর্শ করেনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। একদিকে দেশে বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন, অন্যদিকে একের পর এক বিদেশ সফর করেছেন।

তার এক বন্ধু আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আমি জানি না আগামী সপ্তাহে যখন তিনি ঘুম থেকে উঠবেন, চারপাশটা একেবারে শান্ত থাকবে, কোনো বৈঠকে ছুটে যাওয়ার তাড়া থাকবে না; তখন তার কেমন লাগবে। রেডিও চালিয়ে যখন শুনবেন, কেউ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কথা বলছেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি আর তিনি নন; তখন পরিস্থিতি কেমন হবে, তা ভাবার বিষয়।’

অন্য এক বন্ধু বলেন, ‘তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। এই পরিবর্তনের সময়ে তার চমৎকার পরিবার তার পাশে থাকবে।’

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাজ্যের কিছু সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা হারানোর বেদনা কখনোই পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। যেমন বরিস জনসন। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে শেষ উপস্থিতিতে তিনি স্প্যানিশ ভাষায় ‘আস্তা লা ভিস্তা, বেবি’ (আবার দেখা হবে) বলে বিদায় নিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা, তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন আবারও রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন করবেন।

অন্যদিকে, গত বুধবার পার্লামেন্টে শেষবারের মতো উপস্থিত হয়ে স্টারমারকে দেখা গেছে আবেগপ্রবণ রূপে। গ্যালারিতে বসে থাকা নিজের পরিবারের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও সন্তানদের বলছি, আমি তোমাদের ভালোবাসি।’

আগামী কয়েক সপ্তাহ তিনি স্ত্রী ভিক্টোরিয়া এবং দুই কিশোর সন্তানকে নিয়ে ছুটি কাটাবেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিংবা রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজের কারণে তার প্রায় প্রতিটি ছুটিই ব্যাহত হয়েছিল।

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় বিদায়ী এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাকরিগুলোর একটি হয়তো আমি ছেড়ে যাচ্ছি। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দায়িত্বে ফিরছি; সন্তানদের জন্য একজন ভালো বাবা এবং স্ত্রীর জন্য একজন ভালো স্বামী হওয়ার দায়িত্বে।’

/ইউএস/
সম্পর্কিত
চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলো যুক্তরাজ্য, বেইজিংয়ের প্রতিবাদ
ফ্রান্স থেকে ধরে আনা হলো যুক্তরাজ্যে দণ্ডিত ধর্ষককে
লন্ডন অচল করা সেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হ্যাকার ও তার সহযোগীর কারাদণ্ড
সর্বশেষ খবর
এস আলম-পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্য ৯ আগস্ট
৩৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলাএস আলম-পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্য ৯ আগস্ট
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ বিষয়ে যা বললেন রিজভী
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ বিষয়ে যা বললেন রিজভী
শিরোপা লড়াইয়ের আগে মেসির শেষ বার্তা
শিরোপা লড়াইয়ের আগে মেসির শেষ বার্তা
নোবেলজয়ী ল্য ক্লেজিওর ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের প্রকাশনা
নোবেলজয়ী ল্য ক্লেজিওর ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের প্রকাশনা
সর্বাধিক পঠিত
মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন, আলোচনায় যারা
মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন, আলোচনায় যারা
নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের প্রশ্নে যা বললেন মামদানি
নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের প্রশ্নে যা বললেন মামদানি
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, কারা দিলো কীভাবে?
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, কারা দিলো কীভাবে?
২৭ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি বর্ণার, নদীর পাড়ে বসে কাঁদছেন বাবা
২৭ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি বর্ণার, নদীর পাড়ে বসে কাঁদছেন বাবা
সচিবকে লেখা চিঠিতে ‘আপনার আস্থাভাজন’ কেন লিখছেন এমপিরা
সচিবকে লেখা চিঠিতে ‘আপনার আস্থাভাজন’ কেন লিখছেন এমপিরা