‘ইউনিভারসেল ক্যান্সার বায়োমার্কারের মাধ্যমে মাত্র ১০ মিনিটে ক্যান্সার শনাক্তের প্রযুক্তিটি আমরা ২০১৬ সাল থেকে গবেষণা শুরু করেছি। তিন বছর গবেষণার পর নেচার সাময়িকীতে প্রবন্ধ দেই। এরপরই বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদি কোনও গবেষণা সাধারণ মানুষের উপকারে আসার সম্ভাবনা তৈরি হলে সেটি নিয়ে সবাই বেশ আগ্রহ দেখায়। আমি চাই, ক্যান্সার শনাক্ত করার এই আবিষ্কারটি বিশ্ব মানবতার সেবায় কাজে লাগুক। এই প্রযুক্তি যেকোনও ক্যান্সারের ক্ষেত্রে একটা উত্তর দিতে পারবে।’
শুক্রবার (১৪ ডিসেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থেকে মোবাইলে আলাপকালে এসব কথা বলেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আবু সিনা।
চাঁদপুরের বাবুর হাটের ছেলে ড. আবু সিনা। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন বার্জার পেইন্টস-এ কাজ করেছেন। পরবর্তীতে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। এরপর পিএইচডি করতে অস্ট্রেলিয়া যান আবু সিনা। বর্তমানে স্ত্রী সাবিহা সুলতানা ও ছেলে জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন তিনি।
গবেষণা শুরুর অবস্থা প্রসঙ্গে ড. আবু সিনা বলেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি করতে আসি। এরপর ২০১৬ সালে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করি। টিমে আমি এবং বাকি দুজন অস্ট্রেলিয়ান গবেষক। আমরা তিনজন প্রধান আবিষ্কারক। আমি বাংলাদেশি আবু সিনা, অস্ট্রেলিয়ার ড. লরা কারেস্কোসা ও প্রফেসর ম্যাট্রাউ। আমরা যখন প্যাটেন্ট করেছি এই তিনজন সমানভাবে অংশীদার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে কাজটা করেছি এটা ফান্ডামেন্টাল ডিসকভারি। আমরা ডিএনএর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখেছি যেটা সব ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আমরা যখন এই বৈশিষ্ট্যটা আবিষ্কার করেছি, এটাকে ইউনিভারসাল ক্যান্সার বায়োমার্কার হিসেবে আমরা বলেছি। ডিএনএর বৈশিষ্ট্যটা একটি সার্বজনীন। এটা সব ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এরপরে আমরা পরীক্ষাটা ব্যবহার করি। টিস্যু স্যাম্পল ও ব্লাড স্যাম্পলের মাধ্যমে দেখেছি। নরমালি সবাই যেহেতু ব্লাড স্যাম্পলটা বোঝে তাই সবাই (গণমাধ্যমগুলো) এই বিষয়টাকেই হাইলাইট করেছে।’
নিজেদের পরীক্ষা-পদ্ধতি সম্পর্কে ড. আবু সিনা বলেন, ‘প্রথমে আপনি ব্লাড থেকে ডিএনএটা বের করে নেবেন। এরপর ডিএনএ খালি চোখে দেখার ক্ষেত্রে গোল্ড ম্যানে পার্টিকেলের সঙ্গে আপনি যখন ডিএনএ মিক্সড করবেন তখন এটার সঙ্গে অল্প একটু লবণ যোগ করলে যদি ক্যান্সার হয় মেনোপার্টিকেলের গোলাপি রং সেটা পরিবর্তন হবে না। যদি ক্যান্সার না হয় তাহলে রং পরিবর্তন হয়ে সেটা নীল হয়ে যাবে।’
১০ মিনিটে ক্যান্সার শনাক্ত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১০ মিনিটে টেস্ট সেক্ষেত্রে ডিটেকশনটা করতে ম্যাক্সিমাম ১০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু এর আগে ক্লিনিক্যাল প্রসিডিউর যেটা সাধারণত একটি ক্লিনিকে আপনি যাবেন সেখানে গিয়ে ব্লাড স্যাম্পলটা কেউ একজন কালেক্ট করবে। এরপর সেখান থেকে ডিএনএ বের করবে সেটা করতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগতে পারে। ডিএনএ বের করার পরে এটা ডিটেকশন করতে এই ১০ মিনিট সময়টুকু লাগবে।’
গবেষণাটির একটা সার্বজনীন ব্যাপার আছে উল্লেখ করে ড. আবু সিনা বলেন, ‘ন্যাচার কমিউনিকেশনে পাবলিশ হওয়ার কারণে এটা বেশি হাইলাইটেড হয়েছে। এটার একটা সার্বজনীন ব্যাপার আছে। আমাদের টেস্টটা যেকোনও ক্যান্সারের ক্ষেত্রে একটা উত্তর দিতে পারবে। সাধারণত কোনও মানুষ যখন ডাক্তারের কাছে যায়, চিকিৎসক তখন কিছু টেস্ট দেয়। কোলেস্টেরল ও আয়রন লেভেল দেখে। যদি কোলেস্টেরল বেশি হয় তখন হার্টের প্রবলেম থাকতে পারে। এগুলো টেস্ট করে চিকিৎসক একটা ধারণা পায়। কিন্তু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনও চিকিৎসা পৃথিবীতে নেই। আপনি একজন চিকিৎসকের কাছে গেল তিনি টেস্ট দিয়ে বললেন, এই টেস্ট করেন আপনার স্টেজটা কী আছে দেখি। কিন্তু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এখন যে পদ্ধতিগুলো আছে এমআরআই, সিটিস্ক্যান, এগুলো করার পর তারা যখন বুঝতে পারে আপনার শরীরে ক্যান্সার থাকতে পারে তখন দেখা যায় যে, অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাঁচার হারটা তখন কমে যায়। যদি বছরে একবার একজন মানুষ গিয়ে এই টেস্ট করে তখন যদি পজিটিভ হয় তাহলে দ্বিতীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারেন। ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই যদি এটা করতে পারেন ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী বেঁচে যেতে পারেন। এই কারণেই আসলে এই কাজটাতে সবাই এত প্রমিজিং বলেছে।’
আবিষ্কারটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারে আসতে কতদিন সময় লাগবে, জানতে চাইলে ড. সিনা বলেন, ‘এটা আসলে এখনই বলা কঠিন। যেকোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ট্রায়ালে যেতে হবে এবং বড় ধরনের স্যাম্পল নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে হবে। আমরা এখন যেটা করেছি সেখানে আমরা মাত্র ২০০ ক্যান্সার রোগীর স্যাম্পল নিয়ে কাজ করেছি এবং সেখান থেকে ৯০ ভাগ রেজাল্ট পেয়েছি। কিন্তু এটার আরও কয়েক হাজার স্যাম্পল নিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা যখন একটা টেস্টকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসবো তখন প্রমাণ হতে হবে যে এটা শুধু মানুষের উপকারে আসবে, কোনও ক্ষতির কারণ হবে না।’
নিজের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখন আমি শিক্ষা ছুটিতে আছি। আমি চাই, আমি যেহেতু একজন বাংলাদেশি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আছি। আমি চাই ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাটা বাংলাদেশে করাতে, যেন এদেশের মানুষও এই সুবিধাটা পায়।’








