চলমান ডেঙ্গু যতই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, ততই রোগীদের উৎকণ্ঠিত স্বজনদের পাশাপাশি রাত-দিন এক করে কাজ করছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক- নার্স-মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট-ল্যাব এটেনডেন্টরা। ডেঙ্গুরোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়ার সময় পাচ্ছেন না। কেউ কেউ নিজেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অনেকের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এই ছুটি বাতিলেও তাদের মধ্যে কোনও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি। বরং তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ মোকাবিলার ব্রত নিজ নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন নিরন্তর।
ডেঙ্গুরোগীদের সেবায় যারা দিনরাত এককরে কাজ করছেন তাদের একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের এখানে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) আটজন। অথচ রোগী ভর্তি প্রায় ১৬০০ জন। বাইরে চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী প্রতিদিন দেখা হচ্ছে। তাদের টেস্ট করা হচ্ছে। রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বাইরে বড় করে লিখে দিয়েছে, তাদের কোনও সিট খালি নেই। কিন্তু যেসব রোগী রয়েছেন, তারা যাবেন কোথায়? আমরা তো কাউকে ফেরত দিতে পারি না। যারা ভর্তিযোগ্য রোগী, তাদের ভর্তি করতেই হবে। যতই চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, ল্যাব এটেনডেন্টদের কষ্ট হোক, কোনও রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।’
ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া আরও বলেন, ‘সামনে ঈদ। তাই বাড়তি চাপও আসছে। সবাইকে বলা হচ্ছে ডেঙ্গু টেস্ট করে ঢাকা ছাড়ার জন্য। এর ফলে প্রতিটি হাসপাতালের প্যাথোলজি ল্যাবে যে কী পরিমাণ কাজ করতে হচ্ছে, তা বলে বোঝানোর মতো নয়। দিন-রাত এক হয়ে গেছে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব-অ্যাটেনডেন্টদের। কেউ কেউ কাজের চাপে অসুস্থ হয়েও যাচ্ছেন। তবু, দায়িত্বে পালনে অবহেলা করছেন না। দেশের এই দুর্যোগমুহূর্তে তাদের এই সেবাধর্মকে ধন্যবাদ জানাই।’
এ হাসপাতালেরই ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ডা. কানিজ ফাতেমা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আউটডোরে ( বহিঃবিভাগ) যত রোগী আসে স্বাভাবিক সময়ে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর এখন প্রায় ছয়গুণ বেশি রোগী বেড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে আমরা হিমশিম খাচ্ছিলাম। জনবল সংকট, কিটের সংকট ছিল। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংকট আমরা কাটিয়ে উঠেছি। হাসপাতালের পরিচালক নিজে উদ্যোগী হয়ে বাইরে থেকে জনবল এনেছেন, কিট সংকটও এখন নেই। আমরা এখন মোটামুটি গুছিয়ে উঠেছি, ঠিকভাবে ম্যানেজ করতে পারছি। যদিও আমাদের কাজের প্রেসারটা অনেক বেড়েছে।’
ডা. কানিজ বলেন, ‘অনেক চিকিৎসক মারা গেছেন, অনেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের ঈদের ছুটি বাতিল হয়েছে। ছুটি বাতিল হওয়ায় আমাদের কোনও আক্ষেপও নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি ডেঙ্গু মোকাবিলার।’
জানতে চাইলে মিরপুরের ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মঞ্জুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রতিটি হাসপাতালের ল্যাবের লোকরা। প্রত্যেকে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর না দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।’
ঈদের পর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে ডা. ফরহাদ মঞ্জুর বলেন, ‘এটা না দেখলে বোঝা যাবে না যে, হাসপাতালগুলোর প্যাথলজি ল্যাবে কীভাবে কাজ করা হচ্ছে। গতকাল (৮ আগস্ট) থেকে প্রেসার কিছুটা কমে এসেছে, তারপরও স্বাভাবিক সময়ে চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি কাজ করতে হবে।’
নিজের হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে কাজ করা চিকিৎসকসহ অন্যদের কথা জানিয়ে ডা. ফরহাদ মঞ্জুর বলেন, ‘আমার হাসপাতালে ল্যাবে কাজ করা কয়েকজনকে জোর করে টেস্ট করিয়েছি। তাদের মধ্যে আগে থেকেই তিনজনের পজিটিভ ছিল, তার মধ্যে দুই জনের অবস্থা ভালো নয়। তাই তাদের ছুটি দিয়েছি। তারা বুঝতেও পারেননি যে, তাদের ডেঙ্গু হয়েছে। অথচ দিনরাত রোগীদের ডেঙ্গু টেস্ট-রিপোর্ট নিয়ে কাজ করেছেন তারা।’
ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ অ্যাখ্যা দিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল প্যাথলোজিস্ট ডা. শামীম আর নিপা বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত নয়জন চিকিৎসকের কথা জানি, যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হযেছেন আরও অনেকেই। আগে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের মতো রোগীর রক্ত পরীক্ষা করতাম।’ এখন সেই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলেও তিনি জানান।








