দুই হাতে ব্যান্ডেজ, গলা-মুখের কিছু অংশে মলম লাগানো লাল মিয়ার। এই অবস্থায় তাকে হাসপাতালের বেডে করে নিচতলায় নিয়ে আসেন স্বজনরা। এর কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল ছাড়েন তিনি। লাল মিয়া কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতেন। গত ১১ ডিসেম্বর ওই কারখানায় আগুন লাগলে দগ্ধ হন তিনি। তার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকরা।
বার্ন ইউনিটের নিচতলায় বাড়ি ফেরার আগ মুহূর্তে কথা হয় লাল মিয়ার সঙ্গে। দুই বছর ধরে তিনি এই কারখানায় কাজ করছেন। এমন ট্রাজিক ঘটনার পরও লাল মিয়ার চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে ওঠে। বাসায় গিয়ে এখন কী করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ইনশাল্লাহ সুস্থ হবো। আমাদের কাজ জানা আছে।’
তবে লাল মিয়া আত্মবিশ্বাসী হলেও স্বজনদের মধ্যে তেমনটা দেখা যায়নি। তারা বলছেন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন আহতরা, কিন্তু এরপর কী হবে? কী করে চলবেন তারা? এসব নিয়ে তাদের মধ্যে চিন্তা রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা—সরকার আহতদের কাজের ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন করুক। তাহলে পরিবারগুলো রক্ষা পাবে।
জানা যায়, লাল মিয়াসহ বশির, জাকির, সাজিদ ও আসলামকে বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন জন জিসান, শাখাওয়াত ও সিরাজ এখনও চিকিৎসাধীন আছেন।
ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক এ এফ এম আরিফুল ইসলাম নবীন জানান, গত ১১ ডিসেম্বর প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের পর হাসপাতালে মোট ৩১ জন রোগীকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন রাত আড়াইটা থেকে পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে ১০ জন মারা যান। পরে পাশের শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয় ১২ জনকে। তাদের মধ্যে দুর্জয় নামের একজন রোগী বাড়ি চলে যান। বাকি ৮ জন এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার পাঁচ জনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
১৯ বছরের আসলামের পোড়া ২০ শতাংশ। খালাতো ভাই সাজু হাসপাতালে এসেছেন তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আসলামকে নিয়ে যাবেন সাজু। সাজুর আপন ছোট ভাই সোহান মারা গেছেন এই আগুনের ঘটনায়। সাজু বলেন, ‘সোহান মারা গেছে গত ১৮ ডিসেম্বর। ১৯ ডিসেম্বর ভাইকে কবর দিয়ে আবার এই হাসপাতালে আসি খালাতো ভাইয়ের জন্য। ৮ হাজার টাকা বেতনে আসলাম ও সাজু কারখানাতে চাকরি নিয়েছিল। তারা গত ৫ ডিসেম্বর যোগ দিয়েছিল। বেতনের টাকা পাওয়ার আগেই আগুনে পুড়ে মারা গেলো সোহান।’
বরগুনার ১৯ বছরের মো. বশিরের ২০ শতাংশ পোড়া, দুই পা-দুই হাত, পিঠ ও মুখের একপাশ পুড়ে গেছে তার। বশিরের বড় ভাই মো. নাসির বলেন, ‘তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বশির সবার ছোট, একমাস আগে বশির এই কারখানাতে যোগ দেয় সাড়ে সাত হাজার টাকায়। আমিও এই কারখানায় কাজ করি। আগুনের দিন কারখানায় না থাকায় বেঁচে গেছি।’ কোম্পানি থেকে কোনও খবর নেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে নাসির জানান, এখনও পর্যন্ত কেউ খবর নেয়নি।
কারখানার সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন সাজিদ আহমেদ। আগুনে তার শরীরের ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার স্ত্রী লিসা আহমেদ বলেন, ‘আগুন লাগার পর ভেতরে আটকে পড়া নারীদের বের করতে গিয়েছিল আমার স্বামী। এছাড়া কারেন্টের মেইন সুইচ বন্ধ করা এবং পানি দিতে গিয়ে সেও পুড়েছে। যদি আগে থেকে বের হয়ে আসতো তবে এত বড় সর্বনাশ হতো না। আমার স্বামী বলছে, পাঁচ সেকেন্ড আগেও যদি বের হতে পরতো, তাহলে তার কিছু হতো না।’
এতদিন কাঁদেননি সাজিদ, কিন্তু বৃহস্পতিবার বাসায় ফেরার কথা শুনে কাঁদছেন তিনি। স্ত্রী লিসা বলেন, ‘মেয়েটা বাবাকে চিনবে না—এই ভেবে সাজিদ কাঁদছে। বাড়ি ফেরা আনন্দের খবর হলেও এখন বাড়ি ফিরে কী করবেন, সংসার চলবে কীভাবে—এসব কথা ভাবছি আমি।’
এই হাসপাতাল অনেক করেছে মন্তব্য করে লিসা বলেন, ‘জানি না এখন কী হবে, সরকার যদি একটা চাকরির ব্যবস্থা করতো তাহলে চলতে পারতাম। বেশি লোক তো না, মাত্র আটজন মানুষ সুস্থ হয়েছেন,সরকার যদি ইচ্ছে করে তাহলে পারবে কাজের ব্যবস্থা করতে, সেটা করলে আমরা একটু বেঁচে থাকতে পারবো।’
বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেওয়া এই আটজনের মধ্যে সর্বোচ্চ পুড়েছে শরীয়তপুরের ২৪ বছরের জাকিরের, ২৯ শতাংশ। জাকিরের বোন রিমা আক্তার ভাইকে নিতে আসেন। তিনি বলেন, ‘ভাই আর বাবা কেরানীগঞ্জে থাকেন, আমরা থাকি শরীয়তপুরে। জাকির ওই কারখানায় প্যাকেজিং ডিপার্টমেন্টে ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন।’
রিমা বলেন, ‘ভাই এখন অসুস্থ। পরিবার কী করে চলবে এই সংশয়ে দিন কাটছে আমাদের। ভাইয়ের বেতন থেকেই আমার লেখাপড়া চলতো। এখন ভাই যদি কিছু করতে না পারে, আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার এই লোকগুলোর কাজের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।’








