তাহমিনা আক্তার নামে এক গৃহিণী চারদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। সঙ্গে ডেঙ্গুর অন্যান্য লক্ষণ থাকায় দুদিন পর পরীক্ষা করান। তাতে ডেঙ্গু ‘পজিটিভ’ আসে। তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আরও দুই দিন পর, শারীরিক অবনতি হলে। তাহমিনার সঙ্গে তার ছেলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত। তাই একসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হন তারা। হাসপাতালে ভর্তির পর দ্রুত তার রক্তের প্লা্যাটিলেট কমতে থাকে। তবে চিকিৎসা নেওয়ায় এই যাত্রায় সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। তবে এ জন্য হাসপাতালে কাটাতে হয় আট দিন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৮৯ জন মারা গেছেন। তবে গত ১২ অক্টোবর পর্যন্ত মৃত ৭৫ জনের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। আর মোট মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ শিশু। বাকিদের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ২৯ জন পুরুষ।
মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা ১৮ জন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ জন আর ঢাকার বাইরের ৪৮ জন। এরমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৮ জনও রয়েছেন।
এই ৭৫ জনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম তিন দিনে মারা গেছেন ৪৮ জন, যা মোট মৃত্যুর ৬৪ শতাংশ। ভর্তির চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে মারা গেছেন ১৮ জন। বাকি ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৭ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে।
চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীদের মধ্যে দেরি করে যারা চিকিৎসা নিতে এসেছেন, তাদেরই মৃত্যুর ঘটনা বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির জানান, জ্বর এলে অনেকেই তা গুরুত্ব দেন না। শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে তখন চিকিৎসা নিতে আসেন। এই দেরি করার কারণেই মৃত্যুর হার বেশি।
তিনি আরও বলেন, এবারের ডেঙ্গু রোগীরা বেশিরভাগ ডেঙ্গু শকে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে দেখা যায় আক্রান্তের পাঁচ দিন পর রোগী যখন মনে করে সে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তখনই তাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। জ্বর যখনই কমে আসছে, রোগীর রক্তচাপও কমে যাচ্ছে। সেসময়ে তার ভালোভাবে চিকিৎসা করা প্রয়োজন হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য আরও বলছে, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ শিশু। যাদের বয়স এক থেকে ১৮ বছর। ২০ বছরের বেশি আক্রান্ত হয়েছে ৬২ শতাংশ মানুষ। আর মৃতদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ শিশু। ২১ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ১-১০ বছরের ১২ জন। ১০-২০ বছর বয়সের ১৪ জন, ২০-৩০ বছরের ১৬ জন, ৩০-৪০ বছরের ৮ জন এবং ৪০-৮০ বছরের ২৫ জন।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শাখার ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. ইকরামুল হক জানান, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৩৮ শতাংশ শিশু, যাদের বয়স ১ থেকে ১৮ বছর। ২০ বছরের বেশি আক্রান্ত হয়েছে ৬২ শতাংশ মানুষ। আর মৃতদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ শিশু।
তিনি আরও বলেন, এ বছর ডেঙ্গুতে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি মৃত্যু হয়েছে নারীর। তাছাড়া শিশুদের মৃত্যুর হারও বেশি দেখা যাচ্ছে। এ বছর ১৮ বছরের কম বয়সী ২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে সাত শিশুর।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেছেন, ‘একাধিক সেরোটাইপে সংক্রমণ ঘটায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি।’









