ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানা রোগ ঠেকাতে এখন থেকেই মশারি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু মানুষের আতঙ্ক ও বাড়তি চাহিদার সুযোগে বাজারে মশারি, কয়েলসহ মশানিধনে ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। সরকারের নজরদারির অভাব ও অতি মুনাফার লোভের কারণে এসব জিনিসের দাম বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মশা প্রতিরোধে মশারি আর কয়েল ছাড়াও মানুষ বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, তেল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য ব্যবহার করেন। গত এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম ক্ষেত্রবিশেষে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া কিছু পণ্য কমে বিক্রি হলেও গায়ের দাম অযৌক্তিক।
সরেজমিন রাজধানীর চকবাজার, নিউমার্কেট, পীর ইয়ামেনী মার্কেট, গুলিস্তান, তালতলা নিউমার্কেট, নতুন বাজারসহ কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি দোকানে দেখা গেছে, অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে মশারি, স্প্রে, কয়েল ও বৈদ্যুতিক কয়েল এবং ব্যাটের দাম ও বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে। ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার সুযোগে অনেক ব্যবসায়ী পাইকারি বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি পণ্য এনে মজুত করে রাখছেন। ফলে পাইকারি বাজারে কৃত্রিম সংকটও তৈরি হচ্ছে এসব পণ্যের।
চকবাজারে কয়েলের পাইকারি বাজারে দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি মিলে অর্ধশতাধিক ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ডের মশার কয়েল পাওয়া যায়। এরমধ্যে বেশিরভাগ দেশি কোম্পানির কয়েলে গায়ের দাম ১০০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। পাইকারি বাজারে এসব কয়েলের দাম ৪০ থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রতি প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।
এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত বুস্টার ও বিদেশি কয়েলের গায়ে কোনও দাম না থাকায় পাইকারি বাজারে নির্দিষ্ট দামে বিক্রি হলেও ব্যবসায়ীরা খুচরা বাজারে এসব কয়েল ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছেন। অথচ এক মাস আগেও এসব কয়েলের দাম অন্তত ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত কম ছিল।
চকবাজারের মদীনা ম্যানসনের ম্যানেজার শাকিল আহমেদ জানান, বাজারে সবকিছুরই দাম বেড়েছে, সে তুলনায় কয়েলের দাম কম বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, কয়েল তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, গত বছরের তুলনায় সেগুলোর দাম দ্বিগুণ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব বাজারে এসে পড়েছে।
গুলিস্তান ও পীর ইয়ামেনী মার্কেটে মশারির পাইকারি বাজারে দেখা গেছে, তিন ফুট বাই ছয় ফুট সিঙ্গেল মশারির পাইকারি মূল্য ২০০ থেকে ২৫০ টাকা; পাঁচ ফুট বাই ছয় ফুট ডাবল মশারি পাইকারিতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ম্যাজিক মশারির দাম ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া মানভেদে শিশুদের ফোল্ডিং মশারির পাইকারি দাম ৩০০ থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব মশারিই নিউমার্কেটসহ রাজধানীর অন্যান্য বাজারে খুচরা বিক্রি হচ্ছে পাইকারির দ্বিগুণ দামে।
পীর ইয়ামেনী মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী খাদেমুল ইসলাম জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সঙ্গে সমন্বয় করে মশারির দাম প্রতিবছরই পাইকারি বাজারে কিছুটা বাড়ে, তবে সেটা খুব বেশি নয়। কিন্তু চাহিদা বাড়ায় খুচরা ব্যবসায়ীরা এই সময়ে এসে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দেন।
নিউমার্কেটের মোল্লা অ্যান্ড সন্স নামে মশারির দোকানের স্বত্বাধিকারী আবুল হাশেম বলেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই।
রাজধানীর গুলিস্তান ও নিউমার্কেটে মশারি ও কয়েল ছাড়াও মশা নিধনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্রিম, কীটনাশক, স্প্রে ও ইলেকট্রিক পণ্যের দোকান ঘুরে দেখা গেছে ২৫০ গ্রাম থেকে শুরু করে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত মসকিটো স্প্রে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। ৫০ গ্রাম থেকে শুরু করে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির মসকিটো ক্রিম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ মাসখানেক আগেও এসব পণ্যের দাম অনেক কম ছিল।
গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে র্যাকেট বা কিলার ব্যাট, মসকিটো বেস্ট কিলার, মসকিটো বাল্ব, মসকিটো ভ্যাপ্রোজারসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্য। গত বছরের তুলনায় আমদানি করা এসব ইলেকট্রনিকস পণ্যের দামও বেড়েছে বেশ। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া র্যাকেট বা কিলার ব্যাট ৩৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যেরও এমন দাম বেড়েছে। এ ছাড়া কিছু দেশি প্রতিষ্ঠান আমদানি পণ্য নিজেদের মোড়কে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতেও দেখা গেছে।
এসব পণ্যের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা ডলার ও এলসি সংকটের কারণকে দায়ী করছেন।
ফ্রেন্ডশিপ ইলেকট্রনিক্সের স্বত্বাধিকারী আনিছুর রহমান নাহিদ বলেন, দেশে ডলার সংকটের কারণে মশা বাড়ার এই মৌসুমকে সামনে রেখে আমরা কোনও এলসি খুলতে পারিনি। যেসব আমদানিকারক কিছু পণ্য এনেছেন, তারাও অতিরিক্ত মূল্যে আমাদের সাপ্লাই দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনও নজরদারি না থাকায় নিরুপায় হয়ে ক্রেতাদের বেশি দামেই এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের গায়ে অযৌক্তিক মূল্য লিখে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
নিউমার্কেটে শিমু আক্তার নামে এক ক্রেতা জানালেন, তিনি দুই প্যাকেট কয়েল কিনেছেন ২৪০ টাকায়। এগুলোর প্রতিটার গায়ের মূল্য লেখা ২০০ টাকা করে। তিনি আরও বলেন, পণ্যের গায়ের দামের চেয়েও কম মূল্যে পণ্য কিনছি, তবু ঠকছি। অথচ এগুলো দেখার কেউ নেই।
গুলিস্তানে মশারি কিনতে আসা আরেক ক্রেতা জানান, বাজারে ক্রেতা বাড়ায় এক দামে মশারি বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। যে মশারি কিছুদিন আগে বা গত বছর ২০০ টাকা দাম ছিল, এখন সেটা একদাম ৪০০ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের আতঙ্ক, প্রয়োজন আর চাহিদার সুযোগ নিচ্ছেন এলাকার খুচরা বিক্রেতা ও দোকানিরা। আবার মশা প্রতিরোধে বাজারে যেসব পণ্য আছে, তার চেয়ে চাহিদাও বেশি।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, মশা প্রতিরোধে আমাদের বাজারে যেসব পণ্য আছে, তা যথেষ্ট নয়। আবার ডেঙ্গুসহ নানা মশাবাহিত রোগে মানুষের আতঙ্ককে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। এ জন্য চাহিদা অনুযায়ী বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে নজরদারিও বাড়াতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ জব্বর মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মশা মারার যেসব সরঞ্জাম বাজারে আছে, তার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিবছরই অভিযান পরিচালনা করা হয়। এবারও আমরা অভিযান পরিচালনা করবো। যারা অসাধু ব্যবসায়ী আছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।








