সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আবদুল্লাহ রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জ্বরে কাতরাচ্ছে। পাঁচদিন আগে তার জ্বর আসলে বাসায় চিকিৎসা দিয়েও লাভ হয়নি, অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার সারা শরীর ব্যথা এবং থেমে থেমে জ্বর আসছে। জ্বরের কারণে দিনের বেশিরভাগ সময়ই আবদুল্লাহ কান্নাকাটি করে বলে জানায় তার মা। এছাড়া আর তেমন কোনও উপসর্গ নেই।
দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু। এখন পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ১১৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতে, পুরো ঢাকার সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। দুই সিটি করপোরেশনের সমান সংখ্যক ওয়ার্ডে নির্ধারিত মাত্রার বেশি এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
আক্রান্ত বেশি শিশু ও তরুণী
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে ডেঙ্গু রোগীর ৩৫ শতাংশই শিশু এবং ৬১ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। চলতি বছরের ৪ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ৯ হাজার ৮৭১ রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি বছরের ৪ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৭১ জন নারী, যা মোট আক্রান্তের ৬২ শতাংশ। আর তিন হাজার ৮০০ জন পুরুষ, যা মোট আক্রান্তের ৩৮ শতাংশ। মোট আক্রান্তের ৮ শতাংশের বেশি এক থেকে চার বছর বয়সের শিশু,পাঁচ থেকে ৯ বছর বয়সের ১৯ শতাংশ, এক হাজার ৮৩২ জন ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের। ১৯ থেকে ২৯ বছর বয়সের দুই হাজার ৫৬৯ জন বা ২৬ শতাংশ।
এছাড়া, ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সের আক্রান্ত এক হাজার ৫৮৭ জন বা ১৬ শতাংশ। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সের ৯৯৮ জন বা ১০ শতাংশ। ৫০ থেকে ৬০ বছরের ৮৩৪ জন বা ৮ শতাংশ। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ৪৫১ জন বা ৫ শতাংশ।
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬১ জন, যার মধ্যে ঢাকায় ৪৩৩ জন এবং ঢাকার বাইরে ২২৮ জন। ঢাকায় আক্রান্ত রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভর্তি আছে রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি।
বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) পর্যন্ত মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ৩৫৭ জন। এই হাসপাতালে ২৫০ বেডের হলেও অতিরিক্ত রোগীকে সেবা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত সংখ্যার বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় এই হাসপাতালের কানায় কানায় রোগী পূর্ণ। হাসপাতালের ১০ম তলায় মেডিসিন বিভাগের পুরো জায়গাজুড়ে শুধুমাত্র পুরুষ ডেঙ্গু রোগী ও তৃতীয় তলায় শুধুমাত্র নারী ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ৮ম তলায় শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব ওয়ার্ডের বেড খালি না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতেও চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান বলেন, এবার সবচেয়ে বেশি রোগী হলো লেট রেফারেল (দেরিতে হাসপাতালে আসছে)। আক্রান্তদের অনেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার আক্রান্ত হয়েছে। জটিল বা শকে থাকার রোগীরা সংখ্যায় বেশি। আবার রোগীদের মধ্যে এমন কিছু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, যা ডেঙ্গুর প্রথাগত উপসর্গ নয়। বুঝতে না পারার কারণেও দেরিতে হাসপাতালে আসছে রোগীরা। তারা বাড়িতে থেকে বিভিন্ন ফার্মেসির ওষুধ খেয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছে। পরিস্থিতি যখন গুরুতর হচ্ছে তখন হাসপাতালে আসছে। ফলে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে এলেও অনেকেই মারা যাচ্ছে।
ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান বলেন, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী আমরা সামাল দিচ্ছি, যদিও আমাদের জনবল খুব বেশি নেই। তাছাড়া, আমরা শুধু ডেঙ্গু রোগেরই চিকিৎসা দিচ্ছি তা নয়, সব ধরনের রোগীকেই চিকিৎসা দিচ্ছি। স্বল্প জনবলে একসঙ্গে সব সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও কিছু করার নেই। হাসপাতালে রোগী এলে তাকে তো ফিরিয়ে দিতে পারবো না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৮১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালটির পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল নাজমুল ইসলাম জানান, রোগী বাড়লে চাপ তো বাড়বেই। আমরা চেষ্টা করছি সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেওয়ার।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ১০৬ জন। তবে এখনও চাপ মনে হচ্ছে না বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল রশিদ উন নবী।
রাজধানীর শিশু হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ৩৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে শূন্য থেকে এক বছরের শিশুরা বেশি ভর্তি হচ্ছে। তাদের রোগ সম্পর্কে চিকিৎসকরা বুঝে ওঠার আগেই মারা যাচ্ছে। মোটা ও বেশি ওজনের শিশুদের দ্রুত শক সিনড্রোম দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা আবুল বাশার মো. খুরশীদ আলম বলেন, ঢাকার মুগদা হাসপাতালে রোগী অনেক বেশি। তার আশেপাশের এলাকা থেকে রোগীরা এখানে আসছেন। ওইদিকে রোগী বেশি হওয়ায় মুগদা হাসপাতালেই রোগীরা বেশি যাচ্ছেন। আমরা চেষ্টা করছি মুগদা হাসপাতালের জনবল, লজিস্টিক দিয়ে সাহায্য করার জন্য।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরামর্শ বলছে, যেকোনও ধরনের জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। কোনও অবস্থাতেই ফামের্সি থেকে বা নিজে ওষুধ কিনে খাওয়া যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাধারণ জ্বর মনে করে যদি সময় অতিক্রম করা হয়, তবে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে। তাই সময় অতিক্রম না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং পরীক্ষাটি করাতে হবে।








