চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগামী বছরগুলোতে তা আরও ভয়াবহ হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশক নিধনের পাশাপাশি এই রোগের বিস্তার রোধে ভ্যাকসিন অনুমোদন প্রয়োজন বলে মনে করেন মেডিক্যাল ভাইরোলজিস্টরা।
বুধবার (২৬ জুলাই) 'ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ এবং আমাদের করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভায় ডেঙ্গু ভ্যাকসিন অনুমোদনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে সোসাইটি ফর মেডিক্যাল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশ।
সোসাইটি ফর মেডিক্যাল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. কাজী জুলফিকার মামুনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক আফজালুন নেছা, সোসাইটি ফর মেডিক্যাল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এবং সরকারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. তাহমিনা শিরীন, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. তারেক মাহবুব খান প্রমুখ।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সোসাইটি ফর মেডিক্যাল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশের প্রকাশনা সম্পাদক ও বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি তার বক্তব্যে ডেঙ্গু রোগের সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরেন এবং এই রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে বর্তমান সমস্যা ও সেগুলো সমাধানে বিশ্বব্যাপী প্রয়োগকৃত আধুনিকতম সমাধানগুলো উপস্থাপন করেন।
তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে, জনসচেতনতা ও মশক নিধনের পাশাপাশি এই রোগের বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ও বিশ্বব্যাপী এর প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি কর্তৃক প্রস্তাবিত দুটি ডেঙ্গু ভ্যাকসিন আছে, যেগুলো ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় ২০টির মতো দেশে অনুমোদন পেয়েছে। ভ্যাকসিনগুলোর ডেঙ্গু প্রতিরোধ সক্ষমতা ৮০ শতাংশের উপরে এবং এর প্রয়োগে প্রায় ৯০ শতাংশ ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত ব্যক্তি ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
তার মতে, অতীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এমন কোনও শিশুকে ডেংভাক্সিয়া ভ্যাকসিন দিলে, তাহলে শিশুটি দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে পারবে। তারপরও আক্রান্ত হলে শিশুটির জন্য সেই রোগ কম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তবে এই ভ্যাকসিন শুধু যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তাদেরই দিতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে এই ভ্যাকসিনের অনুমোদন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৪টি দেশে একটি গবেষণায় ৪-১৬ বছর বয়সী প্রায় ২০ হাজার শিশুকে কিউ-ডেঙ্গা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ৮০ শতাংশ ডেঙ্গু জ্বর কমেছে এবং ৯০ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কমেছে।
তিনি বাংলাদেশে এই ভ্যাকসিনগুলো প্রয়োগের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা সব মশা মারতে পারছি না, সব রোগীকেও চিকিৎসা দিতে পারছি না। এমনকি কত রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে সেই তথ্যও পুরোপুরি দিতে পারছি না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কিউ-ডেঙ্গা নামে যে ভ্যাকসিন রয়েছে সেটিকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে দেশে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কারণ এই ভ্যাকসিনটি পরীক্ষার সময় যেসব শিশুর উপর প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশি শিশু ছিল না। আমাদের দেশে এটি কার্যকর হবে কিনা, সেজন্য অনুমোদনের আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা বলেন, কোনও দেশই এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তাই আমরা বলতে পারি না কোন ভ্যাকসিনটি আমাদের দেশে কাজ করবে৷ ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য শুধু সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, অসময়ে বৃষ্টি, ভ্যাকসিন না থাকা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আমাদের সচেতনতার অভাবও দায়ী।








