রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে সরেজমিন দেখা যায়, রক্ত পরীক্ষার জন্য সারি সারি মানুষ অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা বেশি। দেড় বছরের এক শিশুকে স্ট্রেচারে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কী হয়েছে, জানতে চাইলে শিশুর মা বলেন, তিন দিন ধরে জ্বর নামছে না। দুধ খেয়েই বমি করে দেয়। নাপা খাওয়ানো হয়েছে। আজ ডেঙ্গু টেস্ট করানোর পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক। বড় মেয়ে মাত্র ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বেশ কিছু বিদ্যালয়ে নোটিশ দিয়ে জানানো হয়—রবিবার (২৭ আগস্ট) থেকে শিশুদের ফুলপ্যান্ট ও মেয়েদের পাজামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে। শরীরের উন্মুক্ত অংশে মশা যেন কামড়াতে না পারে, সে জন্য এই উদ্যোগ। রবিবার সকালে বেশ কিছু অভিভাবক জানায়, ইতোমধ্যে তাদের অনেকের সন্তান প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত।
সরকারি হিসাবে প্রতি দিন ৮ থেকে ১০ জন রোগীর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবরের পরেও মানুষের সচেতনতা নেই। সবাইকে মশারির নিচে ঘুমাতে বললেও এখনও তা শতভাগ নিশ্চিত করা যায়নি। যেখানে-সেখানে পানি জমতে না দেওয়ার সচেতনতা তৈরির চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। সিটি করপোরেশন বলছে, পরস্পরকে দোষারোপ না করে সবাই নিজ নিজ জায়গায় সচেতন হন। তীব্র জ্বরের ভোগান্তি ও প্রতি দিন স্বজন হারানোর আহাজারির পরেও ন্যূনতম উদ্যোগগুলো নিতে নাগরিকদের মধ্যে তাগাদা নেই। তাহলে কি ডেঙ্গু সয়ে গেলো? চিকিৎসকরা বলছেন, এটা এমন এক চলমান মহামারি, যেটা সয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজকে আমার ঘরে ঢুকেনি ভেবে যারা স্বস্তিতে আছেন, তারাও হয়তো দ্রুত ভিকটিম হবেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল এই রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।
গত শনিবার (২৬ আগস্ট) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৬০ জন এবং ওই সময়ের মধ্যে মারা গেছেন ৯ জন। চলতি বছরে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৫৩৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যমতে— ওই ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৮৩৩ জন ঢাকার এবং ঢাকার বাইরে ১ হাজার ১২৭ জন। এবং সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ৮ হাজার ২৩৬ জন রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ৩ হাজার ৮৪৬ জন, আর বাকি ৪ হাজার ৩৯০ জন ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং ছাড়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৪১১ জন।
হাসপাতালগুলোর দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ডেঙ্গুতে চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত যত রোগী মারা গেছে, অন্যান্য বছর একই সময়ে এত রোগী দেখেনি বাংলাদেশে। হিসাব বলছে, এ বছর প্রতি মাসে যে পরিমাণ রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তা গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তবে শঙ্কার বিষয় হলো— সেপ্টেম্বর মাস এখনও সামনে আছে।
প্রত্যেককে সিরিয়াস হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন বিশ্বের প্রায় দেশেই ছড়িয়ে গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অনেক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা জানি ডেঙ্গু কেন হয়। আমরা এও জানি, ডেঙ্গু কীভাবে প্রতিহত করা যায়। এখন সবার একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। যার যার দায়িত্ব পালন করলে, ঠিকই আমরা এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারবো।’
তিনি বলেন, ‘কীটতত্ত্ববিদরা চিহ্নিত করেছেন— কোথায় কোথায় এডিস মশা বেশি হয়। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি। আর জনগণের জায়গা থেকে সচেতন থেকে যেটুকু করণীয়, সেটা যেন অব্যাহত থাকে। যদি ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হয়, উপায় হলো সবাইকে বিষয়টিতে সিরিয়াস হতে হবে।’
কেন এডিসকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না প্রশ্নে কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এডিস মশা নিধনে কেবল কীটনাশক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করলে সমস্যার সমাধান হবে না, জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য যে মশা নিয়ন্ত্রণ— এই দুটোকে যদি আমরা আলাদা না করতে পারি, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কীটনাশক-নির্ভর করলে হবে না। এই মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে জোর দিতে হবে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনায়।’
এত কর্মসূচি এত ধরনের সচেতনতামূলক প্রচার ব্যবস্থার পরেও মানুষ সতর্ক হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘মানুষকে সম্পৃক্ত করে যদি মশক নিধনের কর্মসূচিগুলো ভাবা না হয়, তাহলে দীর্ঘসময় যে রোগ বিরাজমান, সেটা নিয়ে ভীতি ও আতঙ্ক কমবে না। বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিবেচনায় যদি ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি বলতে হয়— তবে আক্রান্ত ৯০ ভাগ কমবে, মৃত্যু কমতে হবে আরও বেশি। কিন্তু গত কয়েকদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— এ সময় রোগী ভর্তির সংখ্যা কমেছে, রক্ত পরীক্ষার প্রবণতা কমেছে, ডেঙ্গুর ভীতি আতঙ্ক কমেছে, কিন্তু ডেঙ্গু পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি।’’ তিনি বলেন, ‘আক্রান্তের সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হলে সব হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাটা লাগবে। এখন মাঝে মাঝে বৃষ্টির কারণে যেকোনও সময় ডেঙ্গু আরও বাড়তে পারে। ফলে আত্মসন্তুষ্টির জায়গা নেই। জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশা নিধনের বিষয়টিকে আরও জোর দিয়ে দেখা দরকার।’









