তীব্র শীতে বার্ন ইনস্টিটিউটে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা  

সালমা আক্তার শারমিন
১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০০

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির জরুরি বিভাগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ৭০ বছর বয়সী সকিনা। শরীরের একটি বড় অংশই আগুনে পুড়ে গেছে তার।    

ছকিনার মেয়ে জামিলা খাতুনের তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে তার মা দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই সময় ছকিনা নিজের ঘরের সামনে উঠানে বসে আগুন পোহাচ্ছিল। তবে, দুর্ঘটনাবশত এই নারীর পরনের শাড়িতে আগুন লেগে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি টের পেয়ে এই বৃদ্ধা হাত দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। আগুন নেভাতে গিয়ে হাত ও মুখমণ্ডলও ঝলসে যায় তার। 

৭০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার চিৎকারে ছুটে আসে প্রতিবেশীরা। বেলা ১১টার দিকে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে রাজধানীর বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয়। দুর্ঘটনার দিন বিকাল ৪টার দিকে হাসপাতালটিতে ভর্তি হয় ছকিনা। বর্তমানে তিনি অক্সিজেন সাপোর্টে চিকিৎসাধীন। তার গোটা শরীর ব্যান্ডেজে আবৃত হয়ে আছে। 

একই অবস্থা চট্টগ্রামের ৪৫ বছর বয়সী হালিমার। শীত এলেই গরম পানিতে গোসলের অভ্যাস এই মধ্য বয়সী নারীর। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) শীতের সকালে গোসলের জন্য গরম পানি চুলা থেকে নামাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। গরম পানি শরীর ও হাত-পায়ে পড়লে গুরুতর দগ্ধ হন তিনি। 

হালিমার পরিবার দ্রুতই তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে দগ্ধ স্থান থেকে ফ্লুইড বের হয়ে ব্যান্ডেজ ভিজে যায়। রাত ১১টার দিকে বার্ন ইনস্টিটিউটে পৌঁছান তিনি। এরপর তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অপারেশনের পর তাকে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন তিনি। 

এদিকে, ভালুকার ৮ বছর বয়সী শিশু তোহা নিজের বাড়ির সামনে বন্ধুদের সঙ্গে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হন। তার পিঠ, কোমর ও হাঁটুর নিচের অংশ পুড়ে গেছে। ভালুকায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয় তাকে। তোহা বলেন, “কীভাবে কাপড়ে আগুন লাগল আমি বুঝতে পারিনি। হঠাৎ করে শরীরে অতিরিক্ত উত্তাপ অনুভূত হয় এবং মা মা বলে চিৎকার করতে থাকি। আমার কান্নার শব্দে মা ছুটে আসেন এবং আগুন নেভান। মা আসার আগে আমার বন্ধুরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। 

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, শীতে উষ্ণতা পাওয়ার জন্য দগ্ধের শিকার হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। এর জেরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই চিকিৎসক বলেন, “গোসলের জন্য করা গরম পানিতে অনেকে দগ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা কম নয়।” 

ডা. শাওন আরও বলেন, “শুধু খড়কুটোর আগুন বা গরম পানি নয়, চা, কফি, গরম ভাতের মাড় কিংবা রান্নার চুলার আগুনেও অনেকে দগ্ধ হচ্ছেন। শীতকালে আগুনে পুড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি।” এই চিকিৎসকের তথ্যমতে, শীতের সময় বাদে প্রতিদিন বার্ন ইনস্টিটিউটে ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী আসে। তবে, শীত এলেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৬০ থেকে ৬৫-তে গিয়ে দাঁড়ায়। শুধু ঢাকা নয়, উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগী আসে। ঢাকার বাইরের রোগীরা সংকটাপন্ন অবস্থায় বার্ন ইনস্টিটিউটে আসে বলে জানান তিনি। 

শাওন বলেন, “ঢাকার অনেক রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে, জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়াদের আইসিইউ কিংবা সিসিইউতে নিতে হয়। অবস্থা বুঝেই তাদের সেখানে নেওয়া হয়।” অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বেশি থাকে বলে জানান এই চিকিৎসক। 

দুর্ঘটনা এড়াতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে ডা. শাওন। তার মতে, শীতকালে ঘরের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্র শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। গোসলের জন্য গরম করা পানি বালতিতে রান্নাঘর থেকে বাথরুমে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এছাড়া কেউ দগ্ধ হলে ওই স্থানে অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট সাধারণ তাপমাত্রার পানি ঢালার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “পোড়া জায়গায় কোনোভাবেই টুথপেস্ট, ডিম বা বরফ লাগানো যাবে না। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।” 

বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ জানুয়ারির মধ্যেই ৩২৪ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ভর্তি হয়েছেন ৮০ জন। এর আগে গত ডিসেম্বরে ১,২০০ জন এবং নভেম্বরে ১,১৩৮ জন রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ভর্তি হতে হয় ৩৬৪ জনকে। একই বছরের নভেম্বরে এক হাজার ১৩৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ২৯৮ জন ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে এক ১০৯১ এবং ২৬৯। 

৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ৭২টি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে ২০টি এবং হাই-ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ২২টি পুরুষ ও ৩০টি নারী শয্যা আছে। 

ঢাকার বাইরে পাঁচটি সরকারি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। দগ্ধ রোগীদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২২ সালে সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে, করোনা মহামারি ও ঋণের বাধায় তা হয়নি। 

ঢাকার বাইরে সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২২ সালে প্রকল্পটি শুরু হলেও নকশা পরিবর্তন ও সৌদি উন্নয়ন তহবিলের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজে স্থবিরতা আসে। বর্তমানে সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮১৬.১৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। 

আগের এসব উদ্যোগ পর্যালোচনা ও পরিবর্তন করে বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের জন্য হওয়া প্রজেক্টের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৩৬০ কোটি ১০ লাখ টাকা। এসব প্রজেক্টের ব্যয় ৭৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। পাশাপাশি প্রজেক্টের সময়সীমা তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৮ পর্যন্ত করা হয়েছে। 

/এবিএম/এসটি/এমওএফ/ 
সম্পর্কিত
ডেমরায় স্টিল মিলের বাট্টিতে বিষ্ফোরণ, তিন শ্রমিক দগ্ধ
ঈদের ছুটিতে মিটফোর্ডে রোগীর চাপ, চিকিৎসাসেবায় ভোগান্তি
ভারতে তীব্র গরমে বাড়ছে স্নায়ু ও চোখের রোগীর সংখ্যা
সর্বশেষ খবর
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী