ভাইরাসজনিত এবং অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শিশু নিউমোনিয়া, চিকেনপক্স, ডায়রিয়া, যক্ষ্মা, খিঁচুনি বা জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে তারা হাম হলে গুরুতর ও প্রাণঘাতী জটিলতায় পড়ার অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষ করে, যেসব শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাম রোগীতে পূর্ণ সাততলা ভবনের সব ওয়ার্ডই। এমনকি ১২ শয্যার আইসিইউ ও এইচডিইউ ইউনিটসহ অন্যান্য রোগের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোও হাম রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাম রোগীদের জন্য মাত্র আটটি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা তার কয়েকগুণ বেশি। শয্যার সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালটির চিকিৎসক ডা. শ্রিবাস পল বলেন, “হামে আক্রান্তদের ৯০ শতাংশের মধ্যে নিউমোনিয়া দেখা যায়। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হাম রোগী ডায়রিয়াতে ভোগে। প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর কনজাংটিভাইটিস (চোখ লাল হওয়া) হয়।”
তবে, শুধুমাত্র হামের কারণে কোনও মৃত্যু হয়নি তা জানিয়েছেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছে ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট জটিলতার কারণে।”
মহাখালীর সংক্রামক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে ৯ মাস বয়সী আরিফা। বেশ কয়েকদিন হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিলেও এখনও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে এই শিশু।
আরিফার মা জানান, তারা পটুয়াখালী থেকে এসেছে। পাঁচ মাস আগে তার মেয়ের সংক্রামক রোগ ধরা পড়ে। পরে নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। প্রথমে তারা একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরপর বরিশাল সদর হাসপাতালে যান। সেখান থেকে তাকে মহাখালীতে পাঠানো হয়।
বর্তমানে শিশুটি শ্বাসকষ্টে ভুগছে এবং তাকে অক্সিজেন ও স্যালাইন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মায়ের মতে, আগের নিউমোনিয়া কিছুটা ভালো হয়েছিল। কিন্তু পরে আবার হাম দেখা দেয় এবং এখন চিকিৎসা চলছে।
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের অবস্থাও একই। সেখানকার নিচতলায় হাম রোগীর ওয়ার্ড। ১৮ শয্যার এই ওয়ার্ড হাম রোগীতে পরিপূর্ণ।
এক বছর বয়সী শিশু সাইমুল ইসলাম ওয়ার্ডটির এমপি-১ শয্যায় ভর্তি রয়েছে। তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা এই শিশুকে অক্সিজেন ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। সাইমুলের দাদী বলেন, “আমার নাতি জন্ম হয়েছে হার্টের ছিদ্র নিয়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি।
প্রথমে তার জ্বর ও সর্দি হয়। পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।”
চিকিৎসকেরা জানান, জন্মগত হৃদরোগের কারণে সাইমুলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা তার অবস্থাকে আরও খারাপ করেছে। হাম, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ একসঙ্গে হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমান বলেন, “হাম রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত শিশুরা জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “হাম থেকে সেরে ওঠার পরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার কারণে রোগীরা অন্যান্য রোগে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।”
ঢামেক হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান বলেন, “জন্মের পর পর্যাপ্ত মায়ের দুধ না পেলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে তারা হামে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “হাম প্রতিরোধের টিকা ৯ ও ১৫ মাসে নির্ধারণ করা হয়, কারণ জীবনের প্রথম ছয় মাসে শিশু মায়ের দুধ থেকে পুষ্টিগত সুরক্ষা পায়। তাই যেসব শিশু মায়ের দুধ পায় না, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।”
ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান বলেন, “যেসব শিশু আগে খিঁচুনি বা অন্যান্য গুরুতর রোগে ভুগেছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকতে পারে। ফলে তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
এছাড়াও ক্যানসার বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত শিশুরাও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। সার্বিকভাবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে শিশুরা হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।”









