সরকার নারীর স্বাস্থ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশে অন্তত একটি, সম্ভব হলে দুটি ওমেন্স হেলথ ইনস্টিটিউট তৈরি চায় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিসিএফসি) কার্নিভাল হলে ঢাকায় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ইমপ্রুভিং এসআরএইচআর ইন ঢাকা’ প্রকল্পের সমাপনী ফলাফল উপস্থাপনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, সরকার নারীর স্বাস্থ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশে অন্তত একটি, সম্ভব হলে দুটি ওমেন্স হেলথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে বিশেষায়িত সেবা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ থাকবে। আগামী দিনের স্বাস্থ্য সেবায় মানুষকে যেন যেকোন জটিল রোগের জন্য কথায় কথায় ঢাকায় চলে আসতে না হয় সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রাম এলাকায় থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে হেলথ ওয়ার্কফোর্স বিশেষ করে ডাক্তারদের প্রায় ৭০ শতাংশ থাকেন বড় শহরগুলোতে। এই বড় বৈষম্য দূর করতে প্রাইমারি হেলথকেয়ার এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে দেশের ৮০ শতাংশ মায়েরা ও রোগীরা তাদের সেবাগুলো ওখানেই যায়। বাকি ২০ শতাংশ হয়তো উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স পর্যন্ত যেতে হবে। অল্প একটা অংশকে হয়তো বিশেষায়িত সেবার জন্য বাইরে আসতে হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির ফলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। হাসপাতালের অবকাঠামো থেকে শুরু করে জনবল, ওষুধ সরবরাহ ও সাপ্লাই চেইন—সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের সংকট বিদ্যমান।
তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের অল্পদিনের মধ্যেই হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুমও রয়েছে। একই সঙ্গে বাজেট প্রণয়নের কাজও চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দ করেছি।’’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘আমরা ঘোষণা দিয়েছি স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রায় ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে আরও নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।’’
মুহিত বলেন, ‘‘আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারও যখন কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তখন পুরো পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার এক গভীর বিপর্যয় নেমে আসে। আমরা সেই মানবিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য একটি মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি। আমরা কিডনি কেয়ার, ক্যান্সার কেয়ার এবং ওমেনস হেলথ সেবাগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণ (ডিসেন্ট্রালাইজ) করতে চাই।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের লক্ষ্য হলো প্রত্যেক জেলায় অন্তত ক্যান্সার ও কিডনি-সংক্রান্ত সেবাগুলো কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে অধিকাংশ মানুষ নিজ জেলার মধ্যেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।’’
অনুষ্ঠানে প্রকল্প পরিচালক ডা. জিয়াউল আহসান প্রকল্পের পাঁচ বছরের কার্যক্রম ও ফলাফল তুলে ধরে বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও চাহিদা সৃষ্টির উদ্যোগের মাধ্যমে ১০ লাখের বেশি নারী, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর কাছে এসআরএইচআরবিষয়ক তথ্য পৌঁছানো হয়েছে।
তিনি জানান, প্রকল্প–সহায়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ জন সেবা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা–সংক্রান্ত সেবা নিয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫১ জন, মাসিক নিয়মিতকরণ (এমআর) সেবা পেয়েছেন ১৬ হাজার ৯৯৩ জন, এমআর–পরবর্তী ও গর্ভপাত–পরবর্তী সেবা (পোস্ট অ্যাবরশন কেয়ার) নিয়েছেন ৩২ হাজার ৫৪৯ জন এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা–সংক্রান্ত সেবা পেয়েছেন ১১ হাজার ৪৫০ জন।
প্রকল্পের আওতায় রেফারেল হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তৈরি পোশাক কারখানার স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাধারণ চিকিৎসকদের (জিপি) চেম্বারসহ মোট ১৬৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৬ জন স্বাস্থ্যসেবাদাতাকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা, এমআর-পোস্ট অ্যাবরশন কেয়ার ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা–সংক্রান্ত মানসম্মত রিপোর্টিং টুল, ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা প্রদানের সক্ষমতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল তরুণদের সম্পৃক্ততা। এ লক্ষ্যে এক হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবীকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্কুলভিত্তিক প্রচারাভিযান এবং সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সাঈদ রুবায়েত বলেন, বাংলাদেশের নগর স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নগরের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এসআরএইচআর সেবা নিশ্চিত করতে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে কানাডার হাইকমিশনের হেড অব কো-অপারেশন স্টিফেন উইভার।









