হামে নজিরবিহীন শিশুর মৃত্যু, শেষ কোথায়?

আতিক হাসান শুভ
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩০আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩৩

দেশব্যাপী ধীরে ধীরে মহামারি আকার ধারণ করতে শুরু করেছে হাম। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১ হাজার ৯ জন। হামের প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে দেশব্যাপী আলোচনা সমালোচনা ও সরকারের নানান পদক্ষেপের পরেও কিছুতেই কমছে না মৃত্যু। কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই হাজারো বাবা-মা’র বুক খালি করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে অবুঝ শিশুরা। প্রশ্ন উঠেছে হামে শিশু মৃত্যুর শেষ কোথায়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম উপসর্গে ও হামে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে এত মৃত্যু আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা একটা নজিরবিহীন ঘটনা। আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা। দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও গাফিলতিকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন তারা। 

তাদের মতে, সব বয়সী মানুষের হাম হতে পারে, তবে শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হয়। হামের টিকা নেওয়ার পর বা শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। সেই হিসাবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক শিশুর অপুষ্টি বা বিভিন্ন রোগের কারণে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। 

২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৭ জন মারা গেছে

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও সাতজন মারা গেছে। অর্থাৎ গতকাল বুধবার সকাল আটটা থেকে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৯০৯ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০০ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিন দিন হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২৯। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ৯৩৩ রোগীর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।

৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার তাগিদ

হাম প্রতিরোধে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়া জরুরি বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এখন তো ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এটা ৬ মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত এক্সটেন্ড করতে হবে। তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবার গড়ে উঠবে। তাছাড়া অপুষ্টিতে থাকার কারণে অনেক শিশুর প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে।

মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা দেওয়া ছাড়াও আরেকটা হচ্ছে ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি—যেখানে বাংলাদেশের সব মানুষ হামে আক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যখন হামে আক্রান্ত করার মতো কোন মানুষ অথবা শিশু থাকবে না। তাহলে তো আরও হাজার হাজার মৃত্যুর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। একটা ন্যাচারাল ইমিউনিটি— ন্যাচারাল ইমিউনিটিতে হাজার হাজার মৃত্যু হবে। আর টিকা দিলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইমিউনিটি।

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, টিকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু বন্ধ হবে বিষয়টি এমন না। যেদিন টিকা দেওয়া হবে, তার এক মাস পরে হামের সংক্রমণটা কমে আসবে। শুধু টিকা না, টিকাটা হলো গিয়ে প্রাথমিক শর্ত। মৃত্যু কমাতে হলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। রোগীকে কমিউনিটি থেকেই রোগীকে শনাক্ত করে তাকে ব্যবস্থার অধীনে আনা। আইসিইউ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে মৃত্যু কমাতে পারবেন না। আইসিইউর ক্যাপাসিটিও তো বেশি না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের হয়তো আইসিইউ কম আছে, ঠিক আছে। কিন্তু আইসিইউতে আসার আগেই রোগীদের মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট দিতে হবে প্রাইমারি লেভেল প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে, সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ারে। তাহলে এই ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যা কমে আসবে। শুধু আইসিইউ দিয়ে আপনি মৃত্যু কমাতে পারবেন না। শেষ মুহূর্তে আসলে তো আপনি এবং কয়জনকে বাঁচাতে পারবেন? তার জন্য শেষ মুহূর্তে এখানে আসতে না হয়। জ্বর হওয়ার প্রথম থেকেই যেন মেডিক্যাল কেয়ারে থাকে, প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের সেটা আপনার নিশ্চিত করতে হবে। এবং সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ারে আপনাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে হাসপাতালে, বড় হাসপাতালের দরকার নেই। তাহলে আপনার বড় হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে যাবে।

হাম উপসর্গে ও হামে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে এত মৃত্যুর ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি। এর জন্য দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও গাফিলতিকে দায়ী করে এর সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন

হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে আবারও হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে, অবশিষ্ট টিকাও আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

হামে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে বিগত সরকারকে দায়ী করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার দেশে কোনও টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। এ জন্য জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

/এএইচএস/আইএএম/
সম্পর্কিত
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৪৯২
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৯৪
হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হাজার ছাড়ালো
সর্বশেষ খবর
স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেওয়ার পর স্বামীর প্রাণটাও কেড়ে নিলো তারা
স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেওয়ার পর স্বামীর প্রাণটাও কেড়ে নিলো তারা
এক বিদ্যালয়ের ১৩ স্কুলছাত্রীর বিয়ে, অভিভাবকদের ডাকলো প্রশাসন 
এক বিদ্যালয়ের ১৩ স্কুলছাত্রীর বিয়ে, অভিভাবকদের ডাকলো প্রশাসন 
জ্বালানি আমদানি কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের দিকে যাওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
জ্বালানি আমদানি কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের দিকে যাওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে: প্রধানমন্ত্রী
বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে: প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
রয়টার্স এক্সক্লুসিভডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
মান্না-পূর্ণিমা জুটির প্রথম ও শেষ সিনেমা কোনটি
মান্না-পূর্ণিমা জুটির প্রথম ও শেষ সিনেমা কোনটি