একসময় দিন-রাত এক করে জাল-নৌকা নিয়ে হাওরের দিকে ছুটতেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চংনোয়াগাঁও গ্রামের জেলেরা। হাওর থেকে মাছভর্তি নৌকা নিয়ে ফিরতেন তারা। মাছ ধরেই চলতো সংসার, হাওর ও নদীই ছিল তাদের জীবনের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু সেই সুদিন এখন আর নেই। হাওরে মাছ কমে যাওয়ায় পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন অনেক জেলে। কেউ ঢাকার পোশাক কারখানায় কাজ করছেন, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ হয়েছেন রিকশাচালক।
করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের হাওরঘেরা চংনোয়াগাঁও গ্রামে একসময় শতাধিক জেলে পরিবারের বসবাস ছিল। মাছ ধরাই ছিল এসব পরিবারের প্রধান পেশা। এখন মাছের সংকট আর জলমহাল ইজারার নানা জটিলতায় টিকে আছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার।
গ্রামের ছায়া রাণী বর্মণ আক্ষেপ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা নদী ডাইক্যা (ইজারা) আনে, তারাতো আমরারে নদীত মাছ ধরতে দেয় না। যারা নদী ডাইক্যা তারা ট্যাহা চায় ১৫ লাখ। আমরা গরিব মানুষ ১৫ লাখ ট্যাহা কই ফাইয়াম। ট্যাহা বাউ করতে ফারি না, গাংগোও যাইতাম ফারি না। যাইগা ডাহা (ঢাকা)। যে যেডা ফারি, হেইডা কইরা জীবন চালাই।’
মাছের আকাল তুলে ধরে নিজের ছোট নৌকায় বসে সঞ্জয় বর্মণ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে নদীত যে মাছ আছিন, অহন এই মাছ নাই। খালি দেখবাইন ফানি আর ফানি, মাছ নাই। দিন রাইত নৌকা লইয়া ঘুরি, জালো মাছ উডে না। ইজারাওয়ালারে যে ট্যাহা দিয়া গাংগো নামি, হেই ট্যাহাই উডাতাম ফারি না। সংসার চলে না, রেইন (ঋণ) ভাংতাম ফারি না। আমরা অহন কোন পথে যাইয়াম?’
জেলেরা জানান, আগে একটি নৌকা নিয়ে হাওরে গেলে জাল ফেলতেই প্রচুর মাছ উঠতো। অনেক সময় নৌকা ভরে মাছ নিয়ে ফিরতেন তারা। এখন দিন-রাত জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এতে সংসারের খরচ চালানো তো দূরের কথা, অনেকের ঋণের বোঝাও বাড়ছে।
জেলেদের অভিযোগ, হাওরের জলমহালগুলো সাধারণত প্রভাবশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিরা ইজারা নেন। এরপর সেখানে মাছ ধরতে হলে জেলেদের ইজারাদারদের টাকা দিতে হয়। ফলে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
শুধু চংনোয়াগাঁও নয়, কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরেই মাছ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। এর প্রভাব পড়েছে জেলার অন্যতম বড় পাইকারি মাছের বাজার বালিখলাসহ অন্যান্য বাজারেও।
কয়েক বছর আগেও ভোর হওয়ার আগেই শত শত জেলে নৌকা নিয়ে বালিখলা বাজারের ঘাটে ভিড় করতেন। মাছের কেনাবেচায় জমজমাট থাকত পুরো বাজার। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আগের তুলনায় বাজারে মাছের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ মাছ বাজারে আসতো, এখন তার ধারেকাছেও আসে না। মাছ কমে যাওয়ায় ব্যবসার পরিমাণও অনেক কমেছে। এতে বাজারের সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
মাছ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নির্বিচারে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে, ইলেকট্রিক ফিশিং করা হচ্ছে। নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে মাছ চলাচল করতে পারে না, বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। তাই দিন দিন দেশি মাছ কমে যাচ্ছে।’
বালিখলা বাজারের কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী জানান, তিন-চার বছর আগেও এ বাজারে প্রতিদিন দুই থেকে তিন কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হতো। এখন অনেক দিন ৫০ লাখ টাকার মাছও বিক্রি হয় না। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য বলছে, মাছের পরিমাণ কমার পাশাপাশি হাওরগুলোতে কমছে দেশি মাছের প্রজাতিও। একসময় জেলার হাওরগুলোতে ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এর বড় একটি অংশ বিলুপ্ত হয়েছে, বিলুপ্তির পথে অথবা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। মহাশোল, সরপুঁটি, রিটা, পাঙাশ, আইড়, চিতল, পাবদা, কালবাউশ, তিতপুঁটি, গাংমাগুর ও শালবাইমসহ বহু দেশি মাছ এখন বিপন্ন।
ফলে শুধু জেলেদের জীবিকাই নয়, হাওরের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। মৎস্যজীবীরা বলছেন, মাছ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে জলমহালের অপরিকল্পিত ইজারা, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, ইলেকট্রিক ফিশিং, ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন, নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম। এসব কারণে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে বছরে মাছের চাহিদা ৭৩ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে জেলায় মোট মাছ উৎপাদন হয় ১ লাখ ৭ হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে খাল-বিল, প্লাবনভূমি ও পুকুর-ডোবায় উৎপাদন হয় ৭৭ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন মাছ। আর হাওর ও নদ-নদী থেকে পাওয়া যায় ২৯ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন মাছ।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলার মোট মাছ উৎপাদনের পরিমাণ সন্তোষজনক হলেও হাওরের প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। প্রাকৃতিক উৎসের মাছের উৎপাদন ও বৈচিত্র্য ধরে রাখতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই মাছের সংকট সমাধান হবে না। মাছের প্রজনন ও বিচরণের জন্য প্রয়োজনীয় পুরো বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। অবৈধ জাল বন্ধের পাশাপাশি মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং জলমহালের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্য বিভাগ এ লক্ষ্যে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘জেলায় ২১টি অভয়াশ্রম আছে। আরও ২৫টির জন্য নতুন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আর বর্তমানের ইজারা ব্যবস্থাপনার সংস্কার দরকার। আমরা মনে করি উৎপাদনভিত্তিক ইজারা প্রথা চালু করলে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়বে।’
একসময় যে হাওর ছিল জেলেদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা, সেই হাওরেই এখন মাছের আকাল। জাল আছে, নৌকা আছে—কিন্তু নেই আগের মতো মাছ। তাই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় পাড়ি জমাচ্ছেন একের পর এক জেলে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাওরের মাছের পাশাপাশি হারিয়ে যাবে একটি পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবারের জীবন-জীবিকার গল্পও।









