জুনে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন, আর তিন মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জনে। অর্থাৎ জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী ভর্তি বেড়েছে ১৫ দশমিক ০৬ গুণ। এর মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬০৮ জন, মারা গেছেন ৬ জন। সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেড়ে যাওয়ার পর অক্টোবরেও রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৯ হাজার ২০৬ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৩৬ জনে। সেপ্টেম্বরে এক লাফে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৪৩ হাজার।
জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ৪৯১ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। জুনে ডেঙ্গুতে মারা যান ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন। জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ২৫৬ জনের, যা গত বছরের একই সময়ের ২০২ জনের চেয়ে বেশি।
বদলে গেছে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’
গত বছর এ সময়ে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হটস্পট ছিল বরিশাল বিভাগ। এ বছর পরিস্থিতির চিত্র বদলে গেছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগ, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে।
২০২৫ সালে সারা বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন। আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল বরিশাল বিভাগ, যেখানে রোগী ছিলেন ১৭ হাজার ৩৭০ জন। এরপর ঢাকা বিভাগে ১১ হাজার ৬৬৮, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১০ হাজার ৩০৯ এবং চট্টগ্রামে ১০ হাজার ১৯০ জন আক্রান্ত হন। খুলনায় তখন একদিনে সর্বোচ্চ ৭২ জন রোগী ভর্তির রেকর্ড ছিল।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী ঢাকা বিভাগে, সিটি করপোরেশনের বাইরে ১৪ হাজার ৩৮৯ জন। এরপর খুলনা বিভাগে ১৩ হাজার ৪৬৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ হাজার ৮১৮ এবং বরিশাল বিভাগে ১১ হাজার ১৫৫ জন ভর্তি হয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও চট্টগ্রাম ও খুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। চট্টগ্রামে ৩১৯ জন এবং খুলনায় ২৭৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বরিশালে এ সংখ্যা ২১৫ জন।
তরুণদের মধ্যে আক্রান্ত বেশি, মৃত্যুর চিত্রে নারী বেশি
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারী ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বয়সের হিসাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণরা। ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২৪৩ জন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ২০৮ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২০৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত মারা যাওয়া ২৫৬ জনের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ২ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৬২১ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত মোট ৭৮ হাজার ৪৮২ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
অক্টোবরেও বাড়তে পারে রোগী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর মৌসুম আগের মতো শুধু জুলাই-আগস্টে সীমাবদ্ধ নেই। এখন তা আগস্ট-সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি জায়গায় ব্যর্থতা হয়েছে; এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতরে আলাদা রাখা, যাতে মশা কামড় দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু বৃদ্ধির কারণ আমরা ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। যখন কোনো একটা ইনফেকশন শুরু হয়, তখন যদি আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে তো এটা বাড়বেই।’
কবিরুল বাশারের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মশা নিধনের পরিবর্তে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধ করা। পূর্ণবয়স্ক মশা মারা গেলে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে, কিন্তু প্রজননস্থল অক্ষত থাকলে সেখানে আবার নতুন মশা জন্ম নেয়। তাই উৎপাদনশীল প্রজননস্থল শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের ওপর নির্ভর করা টেকসই সমাধান নয়।
আগামী দুই মাসে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের ডেঙ্গুর প্রধান সংক্রমণ মৌসুম এখনও শেষ হয়নি। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ডেঙ্গুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই সরকারের এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর জাতীয় কর্মসূচির প্রয়োজন বলেও মনে করেন কবিরুল বাশার। ফগিংকেন্দ্রিক পুরোনো ধারণা থেকে বের হয়ে প্রজননস্থলভিত্তিক সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী কীটতাত্ত্বিক নজরদারি, কার্যকর রোগ নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একসঙ্গে অভিযান চান বিশেষজ্ঞ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত একযোগে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অভিযানটি একটানা দুই-তিন দিন চালানোর পাশাপাশি প্রতিবছর অন্তত দুবার এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে সরকার সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরকে সবচেয়ে অ্যালার্মিং সময় ধরে তিন মাসের দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান ঘোষণা করেছে।
কী করছে সিটি করপোরেশন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রতি শনিবার সাপ্তাহিক ক্লিনিং ডে পালন করা হচ্ছে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চলছে চিরুনি অভিযান। পাশাপাশি ১২ দিনব্যাপী বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে তথ্যভিত্তিক ওষুধ ছিটানোর কথা রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতি শনিবার বিশেষ মশক নিধন অভিযান এবং ‘শনিবারের অঙ্গীকার, বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপে ডিএনসিসির ২৫টি ওয়ার্ড এডিস সূচকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব এলাকায় বাড়তি স্প্রেম্যান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন।
চট্টগ্রাম সিটিতে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পতেঙ্গা, কমিশনার ঘাটা ও বাটারফ্লাই রোড এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক অভিযান চলছে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নাগরিকদেরও বাসাবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, বালতি ও এসির নিচে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
খুলনা সিটি করপোরেশন তিনটি জোনে ভাগ করে মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতি ওয়ার্ডে বিদ্যমান লোকবলের পাশাপাশি অতিরিক্ত পাঁচজন স্প্রেম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটিতে তিন মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনগুলো বলছে, ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাই প্রধান উপায়। কারণ বাসার ভেতরে জমে থাকা পানিতে সিটি করপোরেশন ওষুধ দিতে পারে না।