কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য, চিন্তাভাবনা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত লিংকডইন পোস্ট লেখা, বক্তৃতা তৈরি করা কিংবা মতামতধর্মী নিবন্ধ প্রকাশের সময় হয়ে ওঠে না অনেকের। তখন তাদের হয়ে লেখার দায়িত্ব নেন এক্সিকিউটিভ গোস্টরাইটাররা।
এক্সিকিউটিভ গোস্টরাইটিং এমন একটি পেশা, যেখানে অন্যের নামে প্রকাশিত লেখার পেছনে থেকে সেই ব্যক্তির হয়ে লেখা তৈরি করা হয়। সাধারণত প্রতিষ্ঠানের সিইও, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ বা শীর্ষ পর্যায়ের পেশাজীবীদের জন্য লিংকডইন পোস্ট, বক্তৃতা, মতামতধর্মী নিবন্ধ এবং বিভিন্ন পেশাগত বক্তব্য লিখে দেন তারা।
কী কাজ করেন গোস্টরাইটাররা?
কাজটা শুধু সুন্দর করে কয়েকটি বাক্য লিখে দেওয়া নয়। যার হয়ে লেখা হচ্ছে, তার চিন্তাধারা, ব্যক্তিত্ব, কাজের ক্ষেত্র এবং বক্তব্যের ধরন বুঝে লেখাটিকে স্বাভাবিক করে তোলাই এই পেশার বড় অংশ।
একজন গোস্টরাইটার সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে লেখার বিষয়, উদ্দেশ্য ও পাঠক সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য, বক্তব্য, পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে তৈরি করেন খসড়া।
তাদের কাজের মধ্যে থাকতে পারে-
সিইও বা শীর্ষ কর্মকর্তার জন্য লিংকডইন পোস্ট লেখা সম্মেলন, সভা বা অনুষ্ঠানের বক্তৃতা তৈরি করা
মতামতধর্মী নিবন্ধ বা অপ-অ্যাড লেখা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ও বার্তা প্রস্তুত করা
সাক্ষাৎকার বা বক্তব্যের খসড়া তৈরি করা
ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ও পেশাগত ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কনটেন্ট তৈরি করা
কর্মকর্তার নিজস্ব ভাষা ও বক্তব্যের ধরন বজায় রাখা
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লেখাটি যেন কৃত্রিম বা অন্য কারও লেখা বলে মনে না হয়। পাঠকের কাছে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজের বক্তব্য বলেই স্বাভাবিক মনে হওয়া প্রয়োজন।
কী ধরনের দক্ষতা দরকার?
এক্সিকিউটিভ গোস্টরাইটিংয়ে ভালো লেখার দক্ষতার পাশাপাশি গবেষণা, যোগাযোগ ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রয়োজন। একজন কর্মকর্তার হয়ে লিখতে হলে তার ব্যবসা, শিল্পখাত, নেতৃত্বের ধরন এবং পেশাগত অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হয়।
ভালো লেখার ক্ষমতা: সহজ, স্পষ্ট, প্রভাবশালী ও পাঠকবান্ধব ভাষায় লেখা তৈরি করতে জানতে হবে।
গবেষণা ও তথ্য যাচাই: প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, বাজার, অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা সংশ্লিষ্ট খাত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
ব্যক্তিত্ব বুঝে লেখার দক্ষতা: প্রত্যেক কর্মকর্তার ভাষা, মতামত ও প্রকাশভঙ্গি আলাদা। তাই তার ব্যক্তিগত স্বর বা ‘ভয়েস’ অনুকরণ না করে সেটি যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।
সাক্ষাৎকার নেওয়ার সক্ষমতা: অনেক সময় কর্মকর্তার চিন্তা ও অভিজ্ঞতা জানতে নিয়মিত আলোচনা বা সাক্ষাৎকার নিতে হয়।
গোপনীয়তা রক্ষা: ক্লায়েন্টের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, ব্যক্তিগত মতামত ও অভ্যন্তরীণ তথ্য গোপন রাখা এ পেশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব।
সম্পাদনা ও সময় ব্যবস্থাপনা: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খসড়া তৈরি, সংশোধন এবং প্রকাশযোগ্য লেখা প্রস্তুত করতে হয়।
কোথায় কাজের সুযোগ রয়েছে?
বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, জনসংযোগ সংস্থা, ব্র্যান্ড পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে এক্সিকিউটিভ গোস্টরাইটারদের কাজের সুযোগ রয়েছে। অনেকে আবার স্বাধীনভাবে বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করেন।
বর্তমানে লিংকডইনসহ পেশাগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, নেতৃত্বের পরিচিতি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে নিয়মিত মানসম্মত লেখা তৈরির প্রয়োজনও বাড়ছে।
বিশেষ করে প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, উন্নয়ন সংস্থা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও বহুজাতিক কোম্পানিতে নেতৃত্বের বক্তব্যকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে দক্ষ লেখকের প্রয়োজন হতে পারে।
পারিশ্রমিক কেমন?
এক্সিকিউটিভ গোস্টরাইটিংয়ে পারিশ্রমিক সাধারণ লেখালেখির কাজের তুলনায় বেশি হতে পারে। কারণ এখানে শুধু শব্দ লেখা নয়, বরং গবেষণা, কৌশল নির্ধারণ, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড বোঝা এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের দায়িত্বও থাকে।
পারিশ্রমিক নির্ভর করে ক্লায়েন্টের পরিচিতি, কাজের ধরন, লেখার দৈর্ঘ্য, গবেষণার প্রয়োজন, নিয়মিত না এককালীন চুক্তি এবং লেখকের অভিজ্ঞতার ওপর। তবে উচ্চ পারিশ্রমিকের পাশাপাশি এ পেশায় দায়িত্ব, গোপনীয়তা ও মান বজায় রাখার চাপও থাকে।
কীভাবে শুরু করা যায়?
সাংবাদিকতা, গণযোগাযোগ, ইংরেজি, সাহিত্য, ব্যবসা বা বিপণন বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিরা এ পেশায় আসতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট ডিগ্রির চেয়ে লেখার মান, গবেষণার দক্ষতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতে লিংকডইন পোস্ট, মতামতধর্মী নিবন্ধ, বক্তৃতা ও পেশাগত প্রোফাইলের জন্য নমুনা লেখা তৈরি করে একটি পোর্টফোলিও গড়ে তোলা যেতে পারে। বিভিন্ন শিল্পখাতের নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের ভাষাশৈলী বোঝার অনুশীলনও কাজে আসবে।








