বেড়ানোর ক্ষেত্রে সিলেট প্রসঙ্গ এলেই চা বাগানের কথা মনে পড়ে যায়। এছাড়া জাফলং কিংবা মাধবকুণ্ডকেও প্রাধান্য দেন অনেকে। কিন্তু সিলেট জুড়ে এমন অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। সেগুলোরই একটি হামহাম ঝরনা। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত এই জলপ্রপাতে যাওয়ার সময় মেলে গভীর বনের মধ্যে ট্রেকিং, অ্যাডভেঞ্চার ও বুনো প্রকৃতির স্বাদ। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। সেইসব গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় রোদ। সবশেষে পাহাড় বেয়ে নেমে কিছুদূর গেলেই হামহাম ঝরনা। মাঝে প্রকৃতি ও পাখির ডাক মন কেড়ে নেবে যে কারও।
রোমাঞ্চপ্রেমীদের কাছে হামহাম ঝরনা আদর্শ এক ট্যুরিস্ট স্পট। সেখানকার প্রতিটি মোড়ে ছড়িয়ে আছে রোমাঞ্চ। হঠাৎ চোখে পড়ে যেতে পারে বন্য শুকর, হরিণ, সাপ অথবা অন্য কোনও প্রাণী। ট্রেকিংপ্রেমীদের জন্য একদিনের ট্যুরের ক্ষেত্রে যুতসই হতে পারে এই জায়গা। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন যে কেউ।
যেতে যেতে ঝিরি পথের (ঝরনার বয়ে যাওয়া পানি অনুসরণের পথ) হিমশীতল জলের কলকল শব্দের সঙ্গে হবে মনের মিতালী। বাকি পথটুকু মায়ায় মোড়ানো। সবুজাভ মায়া। সেখানে রোদ্দুর খেলা করে গাছের ফাঁকে ফাঁকে। চপলা-চঞ্চলা রূপসীর মতো বুনোসুন্দরী হামহামের গড়িয়ে পরা জলের গগনবিদারী সুর কানে কানে মূর্ছনা ছড়ায়। এ এক মায়াবী সৌন্দর্য।
এ বছরের মার্চে ঘুরে আসা আবিদ হাসান বললেন, ‘হামহাম ঝরনায় যাওয়ার সময় ঝিরি পথে না গেলে ট্রেকিংয়ের মজা পাওয়া যায় না। আমাদের ঝিরি পথে যেতে চার ঘণ্টার মতো লেগেছিল। ফেরার সময় পাহাড়ি পথে প্রায় দুই ঘণ্টায় ফিরেছিলাম আমরা।’
গত বছরের জুলাইয়ে ঘুরে আসা পর্যটক জুয়েল রানা বললেন, ‘ট্রেকিংয়ের জন্য হামহাম ঝরনা উপযুক্ত জায়গা। অবশ্যই সব মিলিয়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ট্রেকিং করার মানসিকতা থাকতে হবে। জুন-জুলাইয়ে সেখানে বেশি পানি থাকে। তবে পানি বেশি থাকলে ঝিরি পথে যাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে পাহাড়ি পথে যেতে হবে আড়াই ঘণ্টা।’
হামহাম ঝরনার উদ্দেশে ঢাকা থেকে বাসে মৌলভীবাজার অথবা ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যেতে পারেন। এরপর কমলগঞ্জ যাওয়ার জন্য সিএনজি বা মাইক্রোবাস নিতে হবে। গাড়িতে চাম্পারায় চা বাগানের কলাবনপাড়া গ্রাম পর্যন্ত যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে স্টেশনের সামনেই জিপগাড়ি মিলবে। জিপে চড়ে যেতে হবে কলাবনপাড়া। ভাড়া পড়বে ২ হাজার টাকার মতো। এরপর গাইড নিয়ে হামহামের উদ্দেশে হাঁটতে হবে। গাইডের পারিশ্রমিক জনপ্রতি ৫০ টাকা। গাইড নেওয়া আবশ্যক। এরপর জনপ্রতি ১০ টাকা দিয়ে নাম নিবন্ধন করে বনে ঢুকতে হয়।
ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ ও ভিজিট বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সদস্য সতর্কতা ও টিপস হিসেবে কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন— জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে হাতে-পায়েসহ সারা শরীরে মাখার জন্য কেরোসিন ও সর্ষে তেল এবং জোঁক ছাড়ানোর জন্য লবণ, বাঁশের লাঠি, পর্যাপ্ত খাওয়ার পানি, স্যালাইন, শুকনো খাবার, অ্যান্টিসেপটিক, ব্যান্ডেজ, তুলা, ডেটল, নারিকেল তেল, লবণ।
দুই বছর আগে হামহাম ঝরনায় বেড়াতে গিয়েছিলেন পর্যটক স্মরণ রেজা। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘কলাবনপাড়া গ্রাম থেকে হামহাম ঝরনায় পৌঁছানোর জন্য ঝিরি পথ দিয়ে যেতে লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। কারণ এই পথ অনেক বিপজ্জনক। জোঁক, বাঁশের ভাঙা অংশ ও পিচ্ছিল পাথর থেকে সাবধান। খাড়া পাহাড়-টিলায় ওঠা ও নামার জন্য সঙ্গে একটি লাঠি রাখা ভালো। কাদা বা পাহাড়ের ধার দিয়ে হাঁটতে কাজে দেবে এটি। সেখানে সর্বোচ্চ টিলা ৭০০ ফুট। বনের ভেতর যাওয়ার আগে অবশ্যই ছোট প্যান্ট বা শর্ট প্যান্ট পরে নেবেন। সারাশরীরে বেশি করে তেল মেখে নেওয়া ভালো।’
গত মে মাসে হামহাম ঝরনা ঘুরে এসেছেন অনিমেষ সাহা মিশু। তিনি বললেন, ‘পুরো বন পেরিয়ে ঝরনা ঘুরে আসতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মতো হাঁটতে হয়।’
হামহাম ঝরনার ওপরে উঠলে অন্যরকম অনুভূতি আসে। এজন্য ঝরনার বাঁ-পাশের জঙ্গলের ভেতর প্রায় ৩০-৪০ ফুট খাড়া পাথর বেয়ে উঠতে হবে। এটাই হামহামের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ। সেখান থেকে নামা আরও ঝুঁকির। ফেরার সময় পাহাড়ি পথ ধরলে সময় লাগে কম। আর জোঁক থেকেও কিছুটা বাঁচা যায়। ওই পথ খুব একটা বিপজ্জনক নয়। তবে বৃষ্টির দিনে পিচ্ছিল পাহাড়ে ৫০০ ফুট উঁচুতে উঠতে সাবধান না থাকলে যেকোনও দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকে যায়।








