ট্রাভেলগ

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা

মাসুদুল হাসান রনি, কানাডা থেকে
১৩ জুলাই ২০১৮, ১৮:৫৯আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৮, ১৯:৫৫

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা কানাডায় এসেছি কিন্তু নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখবো না, তা হতে পারে না! তাও আবার টরন্টোতে এসেছি। যেখান থেকে নায়াগ্রার দূরত্ব মাত্র ১২০ কিলোমিটার। কার ড্রাইভিংয়ে দুই ঘণ্টার পথ।
টরন্টো আসার তিন দিনের মধ্যে নায়াগ্রা যাওয়ার সুযোগ মিলে গেলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিমউদ্দীন আহমেদ ফোন করে জানালেন, ‘আমরা নায়াগ্রা যাবো। হাতে কাজ রাখবেন না।’ এ দেখি মেঘ না চাইতে জল!

স্টবো লেনে বাচিকশিল্পী মেরী রাশেদীনের বাসা থেকে ৪ জুলাই সকাল সোয়া ১০টায় রওনা দিলাম। গাড়িতে উঠে বুঝলাম কী অসম্ভব গরম পড়েছে! বাইরে কড়া রোদ। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি। অসহনীয় এ তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছিল ৪৫ ডিগ্রির মতো। সকালে নিউজে দেখেছি— গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড খরতাপে কানাডার জনজীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত। হিট স্ট্রোকে মন্ট্রিলে ১৯ জন মারা গেছেন। সমগ্র কানাডায় সেই মৃতের সংখ্যা হয়েছে ৩২ জন। এ দেশে যেমন হিম ঠাণ্ডায় মানুষ জমে যায়, একইভাবে গরমে মানুষের মৃত্যুও হয়।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে কিংস্টন পেছনে ফেলে আমরা ছুটে চলছি কানাডা-আমেরিকার সীমান্তের দিকে। আমাদের গাড়ি ছুটছে ১৩০ কিলোমিটার বেগে। দু’দিকে মাইলের পর মাইল জনবসতিহীন। অনেকক্ষণ পরপর কিছু ভবন চোখে পড়ে। যেন কাকতাড়ুয়ার মতো একাকী দাঁড়িয়ে আছে!

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা টানা ৭০-৮০ মাইল পর কিছু সময় বিশ্রামের জন্য আমরা হাইওয়ে থেকে কান্ট্রিরোডে ঢুকে পড়ি। সেখানে ২-৩ কিলোমিটার যাওয়ার পর ছোট শপিংমল পেয়ে যাই। স্টারবাকের সামনে গাড়ি রেখে কফি পানের সময় চোখে পড়ে চাইনিজ ম্যাসাজ পার্লার। সেখানে পায়ের মেসেজ নিয়ে মুহূর্তে চনমনে হয়ে ওঠেন আজিম ভাই। আরও ৪০ মাইল গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে এটা তার কাজে এসেছে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় আমরা পৌঁছে যাই প্রকৃতির অপার বিস্ময় নায়াগ্রা জলপ্রপাতে। মাত্রাতিরিক্ত গরম ও গা পুড়ে যাওয়ার মতো কড়ারোদ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের আনাগোনায় মুখর চারদিক। নানান রঙ-বর্ণের মানুষের নানান ভাষা এড়িয়ে কান পাতলেই দূর থেকে শোনা যাচ্ছে নায়াগ্রার জলপ্রপাতের শব্দ। আহা কী মিষ্টি সেই সুর! 

গাড়ি পার্কিং খুঁজতে খুঁজতে দূর থেকে দেখছিলাম বিস্ময় জাগানিয়া নায়াগ্রার অপরূপ সৌন্দর্য। বারবার মনে হচ্ছিল নায়াগ্রার সামনে গেলে হয়তো বাকরুদ্ধ হয়ে যাবো! পার্কিং পেতে দেরি হচ্ছিল বলে আমাকে নায়াগ্রা ক্যাসিনোর উল্টোদিকে নামিয়ে ট্রেজার কানাডার সামনে চলে গেলেন আজিম ভাই।

হাজার হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে নায়াগ্রার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখের সামনে বিস্ময়কর জলপ্রপাত। প্রকৃতির অপরূপ এই সৌন্দর্যে ডুবে যেতে ইচ্ছে জাগে। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে ছুটে নায়াগ্রা দেখি। নায়াগ্রার ওপারেই আমেরিকার বাফেলো। কানাডা-আমেরিকার দু’প্রান্তেই পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। দু’প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছোট বোটে জলপ্রপাতের আছড়ে পড়া উপভোগ করেন।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা ভ্রমণপিপাসুরা প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ঘুরে আসতে পারেন নায়াগ্রা জলপ্রপাত। এর আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে গ্রীষ্মকাল আর বসন্তই হলো উপযুক্ত সময়। ‘মেড অব দ্য মিস্ট’ নামের একটি জাহাজ আছে সেখানে। এতে চড়ে খুব কাছে গিয়ে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতই কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সবচেয়ে দর্শনীয় ট্যুরিস্ট স্পট। গুগল বলছে, ‘নায়াগ্রা নদী প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো। এরও ১৮০০ বছর আগে এটি অন্টারিওর দক্ষিণে প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার বরফে ঢাকা ছিল। সময়ের সঙ্গে আর নিয়মিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবর্তনের ফলে গলতে শুরু করে বরফ। পর্যায়ক্রমে গ্রেট লেকস বেসিনে প্রচুর পানি জমতে থাকে এবং লেক ইরি, নায়াগ্রা নদী ও লেক অন্টারিও থেকে আসা পানি মিলে সৃষ্টি হয় এই বিশাল জলপ্রপাত।’

নায়াগ্রা জলপ্রপাতে তিন ঘণ্টা কানাডায় নদীকে বলা হয় লেক। নায়াগ্রার জলপ্রপাত সৃষ্টিতে লেক ইরি, নায়াগ্রা নদী ও লেক অন্টারিও থেকে বয়ে আসা জলের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলপ্রপাত। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের তিন ভাগের এক ভাগ আমেরিকায়। যা ‘আমেরিকান ফলস’ নামে পরিচিত। বাকি দুই ভাগ কানাডায়, অর্থাৎ তা ‘কানাডিয়ান ফলস’। কানাডার প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখলাম— প্রায় ১৬৭ ফুট উঁচু থেকে তীব্রগতিতে আছড়ে পড়ছে স্বচ্ছ জল।

ঘুরতে ঘুরতে সাস্কাচুয়ান থেকে আসা ইয়াং রজার্সের সঙ্গে পরিচয় হলো। খুব মিশুক এই তরুণ ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তার কাছে জানলাম, প্রতিদিন প্রতি মিনিটে নায়াগ্রা জলপ্রপাত ৬০ লাখ ঘনফুট মাত্রাধিক জল প্রবাহিত করে। যার গড় পরিমাণ ৪০ লাখ ঘনফুট। সমগ্র নিউইয়র্ক ও অন্টারিও’র জলবিদ্যুৎ শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস এই নায়াগ্রা।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সামনে লেখক নায়াগ্রা জলপ্রপাতের আবিষ্কারক কারা? সম্ভবত আমেরিকানরা এই জলপ্রপাত দর্শনকারী ছিলেন। যদিও এই জলপ্রপাত নিয়ে লেখা প্রথম ইউরোপীয় ব্যক্তি ছিলেন ফাদার লুইস হেনেপিন। এই ফরাসি যাজক তার ‘অ্যা নিউ ডিসকভারি’ বইয়ে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে— ‘নায়াগ্রা জলপ্রপাত প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়।’

সত্যিই তাই, তিন ঘণ্টা নায়াগ্রার আশেপাশে বেড়ালাম, তবুও যেন দেখার সাধ মেটে না!

/জেএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম