রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই হাতের বাঁ-পাশে চোখে পড়ে আবর্জনার ভাগাড়। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্যাকেটসহ বিভিন্ন কিছু পড়ে আছে সেখানে। এর পাশেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে বেশকিছু কাঠের গুড়ি। আশপাশে ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। বসার জন্য কয়েকটি গাছের গোড়া কংক্রিট দিয়ে বেঁধে রাখা হলেও কাঠের গুড়ি ও আবর্জনার স্তুপের কারণে সেই সুযোগ নেই। পুকুরের পানির ভেতরে শ্যাওলা ও প্লাস্টিকের পানির বোতল পড়ে আছে।
শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় মায়লা-আবর্জনার স্তুপ থাকায় দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। এসব নিয়ে তাদের বেশিরভাগই হতাশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দিনে দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে থাকবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
চিড়িয়াখানার ভেতর এমন নোংরা পরিবেশ আশা করেননি রাজশাহী নগরীর বহরামপুর এলাকার আব্দুর রউফ। তার মন্তব্য, “এগুলো ‘রুচির’ ব্যাপার। এ ধরনের নোংরা পরিবেশ এখানকার কর্মকর্তাদের অদক্ষতা প্রমাণ করে। জনপ্রতি ২৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আবর্জনার ভেতর সময় কাটাতে আসিনি।”
তবে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রাসিকের ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরুর দাবি, বিভিন্ন সময় ঝড়ে পড়া গাছগুলো কেটে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। তবে প্রতিদিন সকালেই সেগুলো বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, সাজানো-গোছানো ছিমছাম পরিবেশে সময় কাটাতে অনেকে এই পার্ক ও চিড়িয়াখানায় আসে। বাঘ-ভালুক আর সিংহ ছাড়াও বিভিন্ন বন্য পশু-পাখি দেখে চিত্তবিনোদনের খোরাক মেটাতে চান তারা। কিন্তু শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় বাঘ-সিংহ নেই।
দর্শনার্থীরা বলছেন, ‘বাঘ-সিংহ না থাকলে কীসের চিড়িয়াখানা! এটাকে এখন শুধু পার্ক বলা যায়। তাছাড়া চিড়িয়াখানার ভেতরে আবর্জনার ভাগাড় ও কাঠের গুড়ির স্তুপ পার্কের পরিবেশকে নষ্ট করছে। চিড়িয়াখানার ভেতরে অনেক জায়গায় জন্মেছে আগাছা। সেগুলো পরিষ্কারের উদ্যোগ নেই।’
সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য খুলনা থেকে রাজশাহীতে এসেছিলেন সাজ্জাদ হোসেন ও জলি ইয়াসমিন দম্পতি। পরীক্ষা শেষে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যান তারা। তাদের হতাশা, ‘৫০ টাকায় দুটি টিকিট কেটে দেখার মতো তেমন কিছু পেলাম না। সেই সঙ্গে ভেতরে অনেক এলাকায় নোংরা পরিবেশ লক্ষ্য করেছি।’
তবে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাল্টা অভিযোগ, দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার করে না। এ কারণে তৈরি হয়েছে নোংরা পরিবেশ। চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রাসিকের ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরুর মন্তব্য, ‘সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট এলাকায় আবর্জনা ফেললে তেমন সমস্যা হয় না। তাদেরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।’
পুরো পরিবার নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছিলেন ঝিনাইদহ জেলার বেপারিপাড়া এলাকার কাওসার আহমেদ। হতাশা ঝরলো তার কথায়ও, ‘অনেক আশা করে এসেছিলাম। কিন্তু মেয়ের আবদার তেমন মেটাতে পারেনি। জীবন্ত জিরাপ না থাকলেও এখানে ইট-পাথরের জিরাপের সামনে ছবি তুলেছি।’
চিড়িয়াখানার কর্মীরা জানান, ১৯৯৭ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে প্রায় সাড়ে ছয় বছর বয়সী একটি বাঘ আনা হয় রাজশাহীতে। সম্রাট নামের ওই বাঘটি ১২ বছর নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর মারা যায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঘটি পুরনো খাঁচাতেই ছিল। পরে বাঘের জন্য নতুন খাঁচা বানানো হলেও আর বাঘ আনা হয়নি। আগে চিড়িয়াখানায় একজোড়া সিংহ-সিংহী ছিল। ২০১৩ সালে ১৪ বছর বয়সে সিংহীটি মারা যায়। ওই বছর সিংহটিও মৃত্যুবরণ করে। এরপর চিড়িয়াখানায় আর কোনও সিংহ আনা হয়নি।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় সবচেয়ে বেশি আছে কবুতর ও রাজহাঁস। এর বাইরে রয়েছে মেছোবাঘ, বেবুন, গন্ধগোকুল, গিনিপিগ, চীনা মুরগি, বাজ, টিয়া ও চিল। পশু-পাখির মধ্যে আরও রয়েছে ওয়াক, বাজরিকা, বালিহাঁস, ঘুঘু, ঘোড়া, হরিণ, ভালুক, উদবিড়াল, হনুমান, বানর, খরগোশ, মাছমুরাল, নলবক, হাড়গিলা, পেলিক্যান, সাদা বক, ধূসর বক, পেলিক্যান, গাধা, মাছমুরাল ও কালিম পাখি। এছাড়া রয়েছে দুটি করে ঘড়িয়াল ও কচ্ছপ আর একটি অজগর।
রাজশাহী চিড়িয়াখানাটি একসময় রেসকোর্স ছিল। ঘোড়দৌড় খেলা চলতো সেখানে। জনপ্রিয় এই খেলা একসময় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল রেসকোর্স ময়দান। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ৩২ দশমিক ৭৬ একর জমির ওপর উদ্যান গড়ে তোলা হয়।
১৯৯৬ সালে উদ্যানটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) আওতায় দেওয়া হয়। তারপর থেকেই চিড়িয়াখানাটির রক্ষণাবেক্ষণে নিজস্ব বরাদ্দ থেকে ব্যয় করে আসছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু প্রাণী সংকট আর আধুনিকায়নের অভাবে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ৪২ বছরের পুরনো বিনোদন কেন্দ্রটি।
এদিকে মূল ফটকে রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার নাম অনেকটা মুছে গেছে। এ প্রসঙ্গে চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি কামরুজ্জামান কামরু বলেন, ‘জাতীয় চার নেতার অন্যতম একজনের নামে এই জায়গার নামকরণ হয়েছে। অথচ এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা তা দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আমাদের পরিষদ নতুনভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই জায়গায় দর্শনার্থীরা বিনোদনের খোরাক দিতে আবারও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবো। একইসঙ্গে অন্য এলাকা থেকে বাঘ-সিংহ নেওয়ার আসার প্রক্রিয়া করা হবে।’








