খৈয়াছড়া চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত একটি বৃহৎ ঝরনা। এতে মোট ৯টি ধাপ আছে। পাহাড়ের গায়ে দারুণ সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটি। এর আগে তিনবার সেখানে যাওয়া হলেও এবার বন্ধুদের আমন্ত্রণে টিম লিডার হয়ে গেলাম। আমার দলে ছিল সাতজন। সকালের মিষ্টি রোদ মাথার ওপর চড়ে বসতেই আমরা রওনা হলাম।
পিচঢালা পথ শেষ হতেই শুরু হয় কাঁচা রাস্তা। বাকি পথটা ট্রেকিং করেই যেতে হবে। সবাই একটা করে বাঁশের লাঠি হাতে নিলো। এর মাধ্যমে ট্রেকিং করতে অনেক সুবিধা হয়। সাতজনের দল গ্রামীণ সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম ঝিরিতে। এরপরই শুরু উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ। পাহাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও প্রচুর কাদা। তাতে পথ চলতে গিয়ে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। দলের বাকি সদস্যদের কারোই ট্রেকিংয়ের তেমন অভিজ্ঞতা নেই। তাই সবাইকে সামনে রেখে আমাকে পেছনে থেকে চলতো হলো। তাতে হাঁটার গতি অনেকটা বৃদ্ধি পেলো।
আরেকটু সামনে গিয়ে আমরা নেমে গেলাম ঝিরিতে। কখনও পিচ্ছিল পাথর, কখনওবা বিশাল বিশাল বোল্ডার পড়ছিল সামনে। পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে সামনে এগোতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে সবাইকে। তারপরও ঝরনা দেখার অদম্য ইচ্ছাশক্তিই আমাদের পৌঁছে দিলো খৈয়াছড়ার প্রথম ধাপের পাদদেশে। সেখানে প্রায় শ’খানেক ফুট ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পানি পড়ছে। যেন কেউ পাহাড়ে বসে অবিরাম অশ্রুবর্ষণ করে যাচ্ছে! কালো পাথরের গাঁ বেয়ে শুভ্র জলের আছড়ে পড়া দেখতে দারুণ লাগছিল। ঝরনার এমন রূপ দেখে দলের সবাই বিমোহিত। এতক্ষণ হেঁটে আসার ক্লান্তি নিমিষেই উড়ে গেলো! সবাই অপলক দৃষ্টিতে জলপতন দেখছে। কী অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বেশিরভাগ মানুষই খৈয়াছড়া ঝরনার এই নিচের ধাপ দেখেই ফিরে যায়। কারণ ওপরের বাকি ধাপগুলোতে যাওয়া একটু কঠিন।
নিচের ধাপে অনেকক্ষণ থেকে বাকি ধাপগুলো দেখার জন্য আমরা এগোতে লাগলাম। প্রথমেই পাড়ি দিতে হলো প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু খাড়া পাহাড়। বেশি খাড়া হওয়ায় অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে হয়। তবে ওপরের দিকে তাকালে দেখতে যতটা ভয়ঙ্কর মনে হয় ওঠা ততটাই সহজ।
খাড়া পাহাড় পেরিয়ে আমরা নামলাম দ্বিতীয় ধাপে। এদিকের ধাপগুলো খুবই ছোট ছোট আর পানিও খুব একটা নেই। তাই এখানে সময় ব্যয় না করে সোজা চলে গেলাম চতুর্থ ধাপে। ৩০-৪০ ফুটের মত ওপর থেকে জলপতন হচ্ছে। পানির পরিমাণ অনেক বেশি। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। নেমে গেলাম ঝরনার পানিতে। জলপতনের ঢালে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছিল পানি বর্ষণের তীব্রতায় পিঠ ফুটো হয়ে যাবে! পানির তোড়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। আমার দেখাদেখি অন্যরাও ঝরনার পানিতে নেমে এলো। কিছুক্ষণ চললো দাপাদাপি।
চতুর্থ ধাপের ওপর থেকে চার-পাঁচটি ধাপ একত্রে দেখা যায়। এ যেন ঝরনার সিঁড়ি। একধাপে যেখানে পতন হয় পরের ধাপে সেখান থেকেই শুরু হয়। দেখতে বেশ চমৎকার লেগেছে। ছোট ছোট ধাপ পেরিয়ে একেবারে ওপরের ধাপে চলে গেলাম। ওপরের ধাপে আছে একটি প্রাকৃতিক স্লাইডার। যেন কেউ একজন স্লাইড দেওয়ার জন্যই নিখুঁতভাবে খাঁজ কেটে রাখছে। নিচে আছে সুগভীর খুম। তাই স্লাইড দিয়ে হাত-পা ভাঙার কোনও আশংকা নেই। আমার টিমমেটরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্লাইড দিয়ে পানিতে নেমে গেলাম। স্লাইড দিতে দেখে অন্যরাও বেশ মজা পেলো। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও পরে মজা পেয়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকবার স্লাইড দিয়েছিল তারা। স্লাইড দেওয়া আর লাফালাফি করা চললো অনেকক্ষণ। আমার ইচ্ছে ছিল ঝরনার সোর্স পর্যন্ত যাবো। কিন্তু বাকিদের হাঁটার গতি দেখে সেই সাহস আর হলো না।
ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে বিকাল ৩টার ঘর ছাড়িয়ে গেছে। ফিরতে হবে খুব দ্রুত। তাই আমরা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নিচের ধাপে নেমে এলাম। নিচের ধাপটা বরাবরই আকর্ষণীয়। আমার নিষেধ সত্ত্বেও অন্যরা সবাই পানিতে নামলো। তখন তাদের বয়েই গেছে দলনেতার কথা মানতে! ঝরনার সঙ্গে অদ্ভুত মিতালীতে মেতে উঠলো সবাই। সমানতালে চললো ঝরনার পানিতে ভেজা, লস্ফঝস্ফ করা, স্লাইড দেওয়া। ঝরনার কাছে এসে এমন আনন্দ স্বাভাবিকই।








