ভ্যাপসা গরমে পাহাড় ডিঙানোর অভিজ্ঞতা সুখকর হওয়ার কথা নয়। এক চিমটি বাতাসও নেই। সমতল থেকে ততক্ষণে বেশ খানিকটা উপরে উঠে এসেছি। আকাশটা আরেকটু কাছে। কিন্তু মেঘেরা নেই। ছায়ারাও তাই উধাও। প্রতিটি সিঁড়ির হিসাব রাখতে হচ্ছে। এ এক আজব পাহাড় বাওয়া। সিড়ি ভেঙে এগিয়ে যেতে হয় লক্ষ্যের দিকে। এখানে যতবার আসি শুধু এই ব্যাপারটি বড্ড পীড়া দেয়। কে বলতে পারে এজন্যই আসি কিনা!
এতক্ষণে একটা গাছ দেখা গেলো। একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। এখনও বেশ দূরে। আরও অনেকটা ওপরে উঠতে হবে। বাকিদের কোনও খবর নেই। পা ঘষতে ঘষতে উঠছি এখন। স্বয়ং শেষ মহোদয়কেও একসময় শেষ হতে হয়। দুর্দমনীয় ইচ্ছের কাছে হার মানতে হলো তাকে!
নিজেকে আবিষ্কার করলাম বিরুপাক্ষের আঙিনায়। মন্দিরের ভেতর শিব লিঙ্গ আছে একটি। এর আগেও পূজো হতে দেখেছি। এতক্ষণের চিটচিটে গরম আর নেই। আশ্চর্য শীতল চারপাশ। মন্দিরের ছোট্ট চাতালে গা এলিয়ে দিলাম।
চোখ বুজে এসেছিল। সঙ্গীদের ডাকে তন্দ্রা ভাঙলো। বেশি তো নয়, মিনিট পাঁচেক হবে হয়তো। মহাকালের এলাকায় এসেছি। সময় এখানে বড্ড ধীর। অনন্তকাল নামের বোঝা পিঠে বয়ে এখানে টহল দিয়ে বেড়ান স্বয়ং শিব। অনেকে এখানে মনোকামনা পূরণের আশায় পূজো দিতে আসেন। জাগ্রত দেবতা কার আশা পূরণ করবেন তা জানা যায় না অবশ্য কোনোকালেই।
চকোলেট চিবুনো হলো। চারপাশে আচার-অর্চনার জিনিসপত্র ছড়ানো। পাশের গাছটির গায়ে নানান আকারের অনেক ফিতে বাঁধা। দেয়ালে স্পষ্ট করে লেখা— বেশিক্ষণ এখানে অবস্থান করা যাবে না। আবারও হাঁটা।
এবার কিছুটা নেমে যেতে হবে। কিন্তু স্বস্তির কোনও কারণ নেই। চন্দ্রনাথের মূল মন্দির আরও অনেকটা ওপরে। আমরা একটা বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে এখানে এসেছি। সামনে হিমালয়ের একটা বড় ট্রেক। শারীরিক প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিতে চন্দ্রনাথের চূড়ায় দুটো আলাদা পথ দিয়ে ওঠার ইচ্ছে।
চন্দ্রনাথের ইতিহাস নিয়ে নানান কথা শোনা যায়। মূল মন্দিরটি সবচেয়ে উচুঁ চূড়ায় অবস্থিত হলেও এর চারপাশের বিভিন্ন পাহাড়কে কেন্দ্র করে আছে আরও অনেক মন্দির। প্রতি বছর শিব চতুর্দশীতে এখানে বিশাল মেলা বসে। দেশ-বিদেশ থেকে পুণ্যের আশায় আসেন অনেক পরিব্রাজক।
আমরা চলে এসেছি চন্দ্রনাথের চূড়ায়। মন্দিরের দরজা খোলা। গেরুয়া বসন পরা উদোম গায়ে একজন বসে আছেন। সাধু-সন্ন্যাসীদের জীবনাচরণের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। সেই কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম। পরিচয় হলো। তার নাম শিমুল। মন্দিরের মূল পুরোহিতের সঙ্গেই থাকে। নানান কথার ফাঁকে পাতালকালীর প্রসঙ্গ উঠে এলো। মুহূর্তেই বিদ্যুৎচমক খেলে গেলো! অনেকবার অনেক জায়গায় রহস্যময় পাতালকালী, উল্টো কালীর নাম শুনেছি। সেই জায়গা সম্পর্কে শোনা প্রতিটি কথাতেই রহস্য আর ভয়ের একটা ব্যাপার জড়িয়ে আছে। শিমুলকে বলে ফেললাম যাওয়ার কথা। সে আমতা আমতা করে রাজি হয়ে গেলো। দলে আমরা ছয় জন। সবাই এ ব্যাপারে বেশি কিছু জানতো না। বুঝিয়ে বলতেই এককথায় রাজি। অদেখা রোমাঞ্চের খোঁজে এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য ভুলে শিমুলের পিছু চলতে লাগলাম।
যে পথে এসেছি সেই পথে আবারও কিছুদুর গিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামতে শুরু করলাম। সে চুপচাপ তার সঙ্গে আসতে বললো। পাতালকালীতে বিভিন্ন কারণে বাইরের মানুষের যাতায়াত খুব বেশি নেই। রহস্য আর ভয় মেশানো পরিবেশের পাশাপাশি ডাকাতের একটা আতঙ্কের কথা শোনা যায়। মূলত পুজো করার জন্য দলবেঁধে অনেকে এলেই শুধু পাতালকালী মোটামুটি নিরাপদ। এমনই ধারণা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা তো মোটে ছয় জন। উদ্দেশ্য নিছক কৌতূহল নিবৃত্তি।
আশপাশ দেখে মনে হলো স্থানীয় অনেকের যাতায়াত আছে। আশপাশে পেয়ারাসহ বেশকিছু ফলের বাগান চোখে পড়লো। পথ এখন নামছে তো নামছেই। সম্ভবত আকাশসমান উচ্চতা থেকে একেবারে নেমে যেতে হয় বলেই এর নাম পাতালকালী। বেশ অনেকক্ষণ পর একটা ছোট্ট ঝিরি পাওয়া গেলো। সেটি ধরে কিছুদূর এগোতেই একটা ফটকের মতো জায়গা গলে প্রবেশ করলাম পাতালকালীতে।
মধ্যদুপুরের নির্জন পাহাড়ি এই উপত্যকায় নৈঃশব্দের বান ডেকেছে। পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। আশেপাশের গাছে দেবী কালীর প্রচুর স্থিরচিত্র ঝোলানো। লাল সিঁদুর রঙে পাথরগুলো রঞ্জিত। মনে হয় এখনই কোনও জীবের রক্তপানে পিপাসা নিবৃত্ত করবেন দেবী কালী। পুজোর সময় অবশ্য পাঠা বলি হয় এখানে। ঝিরির ঠিক মাঝখানে বিশাল একখানা পাথর। এর নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জলধারা। শিমুল বললো, একসময় এলাকাটি নাকি সাগরের অংশ ছিল। তার গায়ে খোদাই করা যেন একটা মুখচ্ছবি। গাছের আশ্রয়ে জায়গাটা আলো-আঁধারি। ভরদুপুরেও আলোর দাপট নেই। কালীর অবয়ব এখানে উল্টোভাবে আছে। তাই এখানটার নাম ‘উল্টো কালী’।
সনাতন ধর্মীয় মতে, এই দেবী শুভ শক্তির প্রতীক হলেও তিনি বড় নিষ্ঠুর অসূর নাশে। তাকে কেন্দ্র করে তন্ত্রমন্ত্রসহ বহু রহস্যময় ব্যাপারে মিথ প্রচলিত আছে। তার একটি অবয়ব যখন উল্টোভাবে খোদাই করা থাকে কোনও কোনও পাথরের গায়ে, তাও এমন নির্জন স্থানে, রহস্য তো ঘনাবেই। আমার যে একটুও ভয় করছিল না তা বলবো না। তবে অলৌকিক অদেখা কোনও শক্তির চেয়ে তস্করের আগমনের আশঙ্কাই মনে দোলা দিচ্ছিল বেশি। এমন নির্জনতায় ডাকাতের কবলে পড়লে কে আসবে বাঁচাতে। হয়তো উল্টো কালীই রক্ষা করবেন। তারপরও নিজের মানসিক স্থিতধির ওপর তেমন ভরসা পেলাম না। আধঘণ্টার মতো অবস্থান করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রহস্যের উন্মোচন হলো অবশেষে। তবে মনের কোণে উল্টো কালী ঠিকই তার নামের গাম্ভীর্য ধরে রাখলো।
মনে রাখবেন
সীতাকুণ্ড সদর থেকে সরাসরি চন্দ্রনাথ মন্দির প্রাঙ্গণে যেতে হবে। সেখান থেকে উল্টো কালী খুব বেশি দূরের পথ নয়। তবে যথাযথ অনুমতি বা মন্দির সংশ্লিষ্ট কারও অগোচরে একা একা উল্টো কালীতে না যাওয়াই ভালো। গেলেও দলবেঁধে গেলে সুবিধা হয়। হৈচৈ করার কারণে পরিবেশের গাম্ভীর্য নষ্ট যেন না হয় সেদিকে সচেতন থাকা দরকার। এমন কিছু ফেলে আসা যাবে না যাতে পরিবেশের কোনও ক্ষতি হয়।








