সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, ভালো ফলের জন্য উৎসাহ দেওয়া কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করা—এসব নিয়ে অভিভাবকেরা যতটা সচেতন, নাগরিক আচরণ শেখানোর বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ একজন মানুষের চরিত্রের অনেকটাই প্রকাশ পায় সে জনসমাগমে কীভাবে আচরণ করে, তার মধ্যে।
পাবলিক বাস সেই শিক্ষার অন্যতম বড় ক্ষেত্র। এখানে নিজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয় আরও অনেক অচেনা মানুষের। তাই বাসে ওঠা থেকে নামা পর্যন্ত প্রতিটি ছোট আচরণই অন্যের যাত্রাকে আরামদায়ক বা দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত একটি ভ্রমণ শিষ্টাচারবিষয়ক নির্দেশিকায় বিশেষজ্ঞরা এমনই কিছু অভ্যাসের কথা বলেছেন, যেগুলো শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এসব শিক্ষা সমান প্রাসঙ্গিক।
আগে মানুষ নামবে, তারপর ওঠা
বাস থামলেই দরজার সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আমাদের দেশে খুব পরিচিত। কিন্তু সন্তানকে শেখান, আগে যাত্রীদের নিরাপদে নামতে দিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে বাসে উঠতে হবে। এতে শুধু শৃঙ্খলাই বজায় থাকে না, অযথা ধাক্কাধাক্কি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে।
সিটেরও আছে সামাজিক দায়িত্ব
একটি আসন পেলেই সেটি শুধু নিজের সুবিধার জন্য নয়। বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে থাকা অভিভাবকের প্রয়োজন যদি বেশি হয়, তাহলে আসন ছেড়ে দেওয়াই ভদ্রতা।
শিষ্টাচার বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম হ্যানসন দ্য গার্ডিয়ান-কে বলেন, ভদ্র আচরণ আসলে অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।
অন্যের জায়গা দখল নয়
একটি সিটে বসে পাশের সিটে ব্যাগ রেখে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি জায়গা নিয়ে বসা বা হাত-পা ছড়িয়ে অন্যের জায়গা সংকুচিত করে ফেলা—এসব অভ্যাস শিশুদের নিরুৎসাহিত করা উচিত।
গণপরিবহন ব্যক্তিগত নয়, ভাগাভাগি করা একটি জায়গা—এই ধারণাটি ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে গড়ে তোলা জরুরি।
শব্দও হতে পারে অসভ্যতা
মোবাইলের স্পিকার চালিয়ে ভিডিও দেখা, গান শোনা বা উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলা এখন গণপরিবহনের অন্যতম সাধারণ বিরক্তির কারণ। সন্তানকে শেখান, বাসে অন্যরাও বিশ্রাম নিতে, পড়তে বা চুপচাপ ভ্রমণ করতে চাইতে পারেন। তাই হেডফোন ব্যবহার করা কিংবা নিচু স্বরে কথা বলাই ভদ্র আচরণ।
নিজের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিজেরই
গরমের দেশে ঘাম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে যত্নবান হওয়া অন্য যাত্রীর প্রতিও সম্মান দেখানোর অংশ। একইভাবে বাসের ভেতরে নখ কাটা, চুল আঁচড়ানো বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার অন্য কাজগুলোও এড়িয়ে চলতে শেখানো উচিত।
সিটে পা তুলে বসা নয়
জুতা পরা অবস্থায় হোক কিংবা খালি পায়ে—বাসের সিটে পা তুলে বসা অন্য যাত্রীর প্রতি অসম্মানজনক। কারণ সেই সিটেই পরে অন্য কেউ বসবেন। সন্তানকে বোঝান, পাবলিক সম্পদের প্রতি যত্নবান হওয়াও নাগরিক শিক্ষার অংশ।
ভ্রমণ মানেই অন্যের কথাও ভাবা
বাসে খাবার খেতে হলে এমন কিছু বেছে নেওয়া উচিত, যার তীব্র গন্ধ অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলবে না। একইভাবে নিজের ব্যবহৃত টিস্যু, পানির বোতল বা খাবারের মোড়ক বাসে ফেলে না রেখে যথাস্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ছোট অভ্যাস, বড় শিক্ষা
শিশুরা নির্দেশনার চেয়ে অনুকরণ করে বেশি শেখে। তাই বাবা-মা যদি নিজেরাই লাইনে দাঁড়ান, প্রয়োজনে আসন ছেড়ে দেন, মোবাইলের শব্দ কম রাখেন এবং অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখান, তবে সন্তানও সেটিই স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করবে।
ভদ্রতা কেবল ‘ধন্যবাদ’ বা ‘দুঃখিত’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখন কোথায় কতটুকু জায়গা নেব, কতটুকু শব্দ করবো, কিংবা নিজের সুবিধার পাশাপাশি অন্যের স্বাচ্ছন্দ্যের কথাও ভাববো—এসবই নাগরিক শিষ্টাচারের অংশ। আর সেই শিক্ষা শুরু হতে পারে প্রতিদিনের একটি সাধারণ বাসযাত্রা থেকেই।









