যেখানে ট্রেন থেমেছে, সেখানেই শুরু সাইকেলের পথ

ফিচার ডেস্ক
১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩২আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩২

পুরোনো রেললাইনের অন্ধকার সুড়ঙ্গে একটু ভালো করে তাকালেই দেখা মিলতে পারে জোনাকির মতো আলো ছড়ানো গ্লো-ওয়ার্মের। ব্রিসবেন থেকে আসা পর্যটক পল হিক্সনের চোখে এ যেন উত্তর নিউ সাউথ ওয়েলসের এক হারিয়ে যাওয়া রেলপথের নতুন জীবন।

দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাইকেলে চেপে তিনি ঘুরছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন রিভার্স রেল ট্রেইলে। সেদিন তাঁদের গন্তব্য ছিল বারিংবার টানেল পর্যন্ত।

পুরোনো এই রেলপথের ৯টি সুড়ঙ্গের মধ্যে বারিংবার টানেলই সবচেয়ে দীর্ঘ। ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার পর প্রকৃতি ধীরে ধীরে জায়গাটি নিজের করে নিয়েছে। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে আশ্রয় নিয়েছে গ্লো-ওয়ার্ম ও ক্ষুদ্র বাদুড়। তাই দিনের ঝকঝকে রোদেও সুড়ঙ্গের গভীরে তাকালে দেখা মিলতে পারে ক্ষীণ আলোর সেই আশ্চর্য দৃশ্যের।

তবে শুধু হিক্সন ও তার দুই মেয়েই নন, এই রেল ট্রেইলে প্রকৃতির টানে ছুটে আসছেন আরও অনেকে। ঘন বৃষ্টিবনের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া পথে কোথাও কেউ বই পড়তে বসেছেন, আবার কোথাও তরুণ যুগল দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন সাইকেল আরোহীদের যাতায়াত।

পুরোনো রেললাইনটি এখন যেন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি, ইতিহাস ও ধীরগতির ভ্রমণের এক অনন্য পথ।

এখনও পুরো রেল ট্রেইলটি একটানা চালু হয়নি। বর্তমানে এটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। একটি টুইড নদী এলাকার দিকে, অন্যটি পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলে ক্যাসিনো ও লিসমোরের মাঝামাঝি। তবে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একদিন সাইকেলে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া যাবে।

এই দীর্ঘ যাত্রা শুরু হবে টুইড এলাকার আখের ক্ষেত থেকে। সেখান থেকে উপকূল বরাবর দক্ষিণে এগিয়ে পথ যাবে মুলাম্বিম্বি ও বায়রন বে হয়ে। এরপর সমুদ্রতট ছেড়ে রেল ট্রেইল ঢুকে পড়বে অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের দিকে ব্যাঙ্গালোর, লিসমোর ও ক্যাসিনো পেরিয়ে।

অর্থাৎ, একটি পথেই দেখা মিলবে আখের খেত, ঘন বৃষ্টিবন, সমুদ্র, ছোট শহর, সবুজ পাহাড় ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ ভূদৃশ্যের নানা রূপ।

সাইকেলভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে দীর্ঘ পথের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই আপাতত বড় বাধা তৈরি হয়েছে।

জুনে বায়রন ও লিসমোর শায়ার কাউন্সিল যৌথভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৪ কোটি ২০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার অনুদান চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রেল ট্রেইলের মাঝখানে থাকা প্রায় ৫৪ কিলোমিটার অসম্পূর্ণ অংশ নির্মাণ করা। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

বায়রন শায়ারের মেয়র সারা এনদিয়ায়ে সিদ্ধান্তটিকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তটি ছিল অপ্রত্যাশিত। তার ধারণা, সরকার হয়তো তুলনামূলক ছোট প্রকল্পগুলো বেছে নিয়েছে, যাতে বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত প্রভাব দেখানো যায়।

তবে তার বিশ্বাস, পুরো রেল ট্রেইল নির্মিত হলে শুধু পর্যটনই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও এর বড় সুফল মিলবে।

একটি পূর্ণাঙ্গ রেল ট্রেইল স্থানীয় মানুষকে সাইকেল চালানো, হাঁটা ও প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে পর্যটকেরা দীর্ঘ দূরত্বের সাইকেলভ্রমণের মাধ্যমে একাধিক শহর ও প্রাকৃতিক আকর্ষণকে এক যাত্রায় দেখতে পারবেন।

স্থানীয় কৃষকদের সুবিধার জন্য নির্মিত লিসমোর-টু-টুইড শাখা রেলপথ ১৮৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। এর আগে প্রায় এক দশক ধরে চলেছিল দাবি, পরিকল্পনা ও নির্মাণের প্রস্তুতি।

বাষ্পচালিত ট্রেনের যুগ পেরিয়ে রেলপথে এসেছিল ডিজেলচালিত ট্রেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা রূপে রেল পরিষেবা চালু থাকার পর শেষ পর্যন্ত ২০০৪ সালে এক্সপিটি পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে নীরব হয়ে পড়ে এই পাহাড়ি অঞ্চলের রেললাইন।

শেষ ট্রেনটি যখন স্টেশন ছেড়ে যায়, তখন প্রায় ২০০ মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের হাতে ছিল মোমবাতি, প্রতীকী কফিন ও প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড। রেল পরিষেবার বিদায় যেন ছিল একটি যুগের অবসান।

কিন্তু রেলপথটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। রেল পরিষেবা ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন এখনও রয়েছে। নর্দার্ন রিভার্স রেল লিমিটেডের লিডিয়া কিন্ড্রেড সেই উদ্যোগের অন্যতম সমর্থক।

তাদের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে বায়রন বে থেকে মুলাম্বিম্বি পর্যন্ত একটি বিদ্যমান সৌরশক্তিচালিত ট্রেন পরিষেবা সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চার ধাপের পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার রেলপথ লিসমোর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে।

তবে রেল ট্রেইল ও ট্রেন পরিষেবাকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন না কিন্ড্রেড। তার মতে, দুটিই পাশাপাশি থাকতে পারে।

একদিকে পুরোনো রেলপথে ট্রেন ফিরতে পারে, অন্যদিকে একই করিডরের অংশবিশেষ সাইকেল ও হাঁটার পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। পর্যটন, পরিবহন ও বিনোদনের এই সমন্বিত মডেল ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও উদাহরণ হতে পারে।

নর্দার্ন রিভার্সের ১৩৫ কিলোমিটারের রেল ট্রেইলের স্বপ্ন আপাতত অর্থায়নের বাধায় থমকে আছে। কিন্তু এরই মধ্যে চালু থাকা অংশগুলোতে সাইকেলের চাকা ঘুরছে। পুরোনো রেললাইনের পাশে এখন ট্রেনের শব্দ নেই। তার বদলে আছে সাইকেলের ঘণ্টা, বৃষ্টিবনের পাখির ডাক, দূরের সমুদ্রের গর্জন আর সুড়ঙ্গের অন্ধকারে গ্লো-ওয়ার্মের ক্ষীণ আলো।

যে পথে একসময় ট্রেন ছুটত, সেই পথই এখন মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির আরও কাছে।

ট্রেন থেমে গেছে, কিন্তু যাত্রা থামেনি। বরং পুরোনো রেলপথে শুরু হয়েছে নতুন এক ভ্রমণ সাইকেলের চাকার, প্রকৃতির আর ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রিন্সেস ডায়ানার অজানা কথা জানাতে নতুন বই লিখলেন ভাই
প্রিন্সেস ডায়ানার অজানা কথা জানাতে নতুন বই লিখলেন ভাই
৬ পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার
৬ পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার
কলকাতা-লন্ডনে ১০ বাংণাদেশির প্রাণহানিতে গোলাম পরওয়ারের শোক
কলকাতা-লন্ডনে ১০ বাংণাদেশির প্রাণহানিতে গোলাম পরওয়ারের শোক
দুর্নীতির মামলা: সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রথম দিনেই সাক্ষ্য হয়নি
দুর্নীতির মামলা: সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রথম দিনেই সাক্ষ্য হয়নি
সর্বাধিক পঠিত
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
নাটোরের ডিসি প্রত্যাহার, এক উপজেলার ইউএনও বদলি
নাটোরের ডিসি প্রত্যাহার, এক উপজেলার ইউএনও বদলি
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়েছিলেন, ধরে পিটিয়ে মেরে ফেললো একদল লোক
ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়েছিলেন, ধরে পিটিয়ে মেরে ফেললো একদল লোক
আরেক কনেকে বিয়ে করলেন সেই প্রবাসী, পাতে পেলেন আস্ত খাসি
আরেক কনেকে বিয়ে করলেন সেই প্রবাসী, পাতে পেলেন আস্ত খাসি