ইউরোপ ভ্রমণের তালিকায় স্পেন অনেকেরই পছন্দের স্থান। চোখজুড়ানো সমুদ্রসৈকত, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, প্রাণবন্ত রাতের জীবন আর বৈচিত্র্যময় খাবারের সংস্কৃতি দেশটিকে করে তুলেছে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।
তবে স্পেনকে বুঝতে হলে শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখলেই হবে না। দেশটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় রয়েছে বেশ কিছু অলিখিত সামাজিক নিয়ম, যা পর্যটকদের জন্য শুরুতে কিছুটা অচেনা মনে হতে পারে।
স্প্যানিশ জীবনযাত্রা বেশ স্বচ্ছন্দ। ‘তাড়াহুড়োর কিছু নেই’ এবং শান্ত হও’ বা ‘আরাম করো’ এ ধরনের কথা সেখানে প্রায়ই শোনা যায়। দুপুরের খাবার চলে দীর্ঘ সময়, রাতের আড্ডা গড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত। আর ‘সিয়েস্তা’ শব্দটির সঙ্গেও কমবেশি সবাই পরিচিত।
কিন্তু এই নির্ভার জীবনযাপনের মধ্যেও রয়েছে নিজস্ব নিয়ম। লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে খাবারের সময়, ব্যক্তিগত পরিসর এবং এমনকি কোন সময়ে কোন খাবার খাওয়া উচিত সবকিছুরই রয়েছে নিজস্ব সামাজিক রীতি।
স্পেনে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে সহজে মিশতে এবং অপ্রস্তুত পরিস্থিতি এড়াতে জেনে নিন এমন পাঁচটি অলিখিত নিয়ম।
১. লাইনে দাঁড়ানোর নিয়মটা একটু আলাদা
স্পেনের কোনও বাজার, ফার্মেসি, বেকারি, বার কিংবা স্থানীয় দোকানে গেলে হয়তো প্রথমেই চোখে পড়বে কোথাও গোছানো লাইন নেই। মানুষজন এদিক-ওদিক ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
বিষয়টি পর্যটকদের কাছে বিভ্রান্তিকর হলেও স্পেনে এটি বেশ স্বাভাবিক। ছোট দোকান বা বাজারের সরু জায়গায় সবাইকে এক সারিতে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না। তাই কে সবার শেষে এসেছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কী করবেন?
দোকানে ঢুকে কাছের কাউকে জিজ্ঞেস করুন, ‘সবার শেষে কে? কেউ না কেউ সবার শেষে থাকা ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেবেন। এরপর আপনি চাইলে পণ্য দেখতে অন্যদিকে যেতে পারেন। আপনার পালা এলে আপনি সুযোগ পাবেন।
তবে মনে রাখবেন, কিছুক্ষণ পর আপনাকেও কেউ একই প্রশ্ন করতে পারেন!
২. খাবার শেষ মানেই টেবিল ছাড়ার সময় নয়
স্পেনে খাওয়াদাওয়া অনেক সময় শুধু খাবার খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শেষ কামড় খাওয়া এবং শেষ গ্লাস পানীয় শেষ করার পরও অনেকেই টেবিলে বসে গল্প করেন। এই রীতির নাম লা সোব্রেমেসা। খাবারের পর দীর্ঘ সময় টেবিলে বসে আড্ডা দেওয়া, কফি বা পানীয় খাওয়া এবং একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
এর শিকড় রয়েছে স্পেনের কৃষিনির্ভর অতীতে। দুপুরের খাবারের পর তীব্র গরমের কারণে কৃষকদের সঙ্গে সঙ্গে মাঠে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই পরিবারের সদস্যরা টেবিল ঘিরে বসে সময় কাটাতেন।
বর্তমানে জীবনযাত্রা বদলালেও সোব্রেমেসার জনপ্রিয়তা কমেনি।
কী করবেন?
স্পেনে খাবারের পর টেবিলে আরও কিছুক্ষণ বসে থাকাকে অস্বাভাবিক মনে করা হয় না। খাওয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিল চাইতে ব্যস্ত হবেন না। ফোনটা সরিয়ে রেখে সঙ্গীদের সঙ্গে গল্প করুন। যখন সত্যিই চলে যেতে প্রস্তুত, তখন হাত তুলে বিল চাইতে পারেন।
৩. সূর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুন
স্পেনের জীবনযাত্রার সময়সূচি অনেক পর্যটকের কাছেই অদ্ভুত লাগতে পারে। দুপুরের খাবার দেরিতে, রাতের খাবার আরও দেরিতে। আবার দুপুরের পর অনেক দোকান কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে।
এর পেছনে রয়েছে সূর্যের তাপের সঙ্গে মানিয়ে চলার দীর্ঘ ঐতিহ্য। ঐতিহাসিকভাবে স্পেনের কৃষকেরা খুব ভোরে কাজ শুরু করতেন। সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই কাজ শেষ করতেন এবং এরপর দুপুরের খাবার খেতেন।
১৯৪০-এর দশকে জেনারেল ফ্রাঙ্কো স্পেনের ঘড়ির সময় এক ঘণ্টা এগিয়ে দেন। এতে দেশটির সময় মধ্য ইউরোপের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা খুব একটা বদলায়নি। ফলে দুপুরের খাবার ও রাতের খাবারের সময় আরও পিছিয়ে যায়।
বর্তমানে স্পেনে সপ্তাহে গড়ে ৩৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা কাজ হয়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৩৫ দশমিক ৯ ঘণ্টার গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি। পাশাপাশি দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী সিয়েস্তা এখন আগের মতো নিয়মিত নয়। দুপুরের খাবারের পর বাড়ি ফিরে ঘুমানোর বদলে অনেকে অফিসে ফিরে যান কিংবা ব্যক্তিগত কাজ সারেন।
কী করবেন?
দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তীব্র গরমের সময়টি এড়িয়ে দিনের পরিকল্পনা করুন। কোনও দোকান বা দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার আগে খোলার সময় দেখে নিন।
রাতের খাবারের ক্ষেত্রেও একটু ধৈর্য ধরুন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাধারণত পর্যটকদের জন্য তৈরি রেস্তোরাঁগুলোই বেশি খোলা থাকে। রাত ৮টা ৩০ মিনিট বা ৯টার দিকে খেতে গেলে ভালো মানের স্থানীয় রেস্তোরাঁয় যাওয়ার সুযোগ বেশি।
৪. ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে বেশি চিন্তা করবেন না
স্পেনে মানুষের সামাজিক আচরণে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা খুবই স্বাভাবিক। কথা বলার সময় বাহুতে হাত রাখা, আলিঙ্গন করে অভিবাদন জানানো কিংবা অপরিচিত মানুষের কাছাকাছি দাঁড়ানো সেখানে অস্বাভাবিক নয়।
কী করবেন?
কেউ খুব কাছে দাঁড়ালে সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে অভদ্রতা হিসেবে নেবেন না। ব্যস্ত জায়গায় অনিচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কিকে স্বাভাবিকভাবেই নিন। কারও পাশ দিয়ে যেতে হলে ‘ক্ষমা করবেন’ বলতে পারেন। জবাবে প্রায়ই শুনবেন ‘কোনও সমস্যা নেই’।
৫. রাতের খাবারে পায়েয়া, বারে স্যাংগ্রিয়া নয়
স্পেনে পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত খাবার ও পানীয়ের নাম সম্ভবত পায়েয়া, তাপাস ও স্যাংগ্রিয়া। কিন্তু স্থানীয় খাবারের বৈচিত্র্য এর চেয়ে অনেক বেশি।
স্পেনের মূল ভূখণ্ডে রয়েছে ১৭টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। প্রতিটি অঞ্চলেরই রয়েছে নিজস্ব খাবারের ঐতিহ্য। তাই যে শহরে যাচ্ছেন, সেখানকার স্থানীয় খাবার চেখে দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করাই ভালো।
পায়েয়া ভ্যালেন্সিয়া ও কাতালোনিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে বিশেষ পরিচিত। তবে স্থানীয়দের মতো খেতে চাইলে পায়েয়া দুপুরের খাবারেই অর্ডার করুন। এটি তুলনামূলক ভারী খাবার হওয়ায় রাতে খাওয়া খুব একটা প্রচলিত নয়।
পিনচোসের বৈচিত্র্য উপভোগ করতে চাইলে যেতে পারেন বাস্ক অঞ্চলে। শীতকালে মাদ্রিদে গেলে মাংস ও ছোলা দিয়ে তৈরি কোসিদো এবং গরমকালে আন্দালুসিয়ায় গাসপাচো চেখে দেখতে পারেন।
স্যাংগ্রিয়াও স্পেনে জনপ্রিয়। তবে স্থানীয়রা সাধারণত বারে বসে এটি পান করেন না। পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে পাঞ্চ হিসেবে স্যাংগ্রিয়া বেশি প্রচলিত।
কী করবেন?
খাবারের ছবিসহ মেনু দেখলে একটু সতর্ক হোন। অনেক সময় এগুলো পর্যটকদের লক্ষ্য করে তৈরি রেস্তোরাঁর বৈশিষ্ট্য হতে পারে।
স্থানীয় খাবার চেখে দেখতে চাইলে সপ্তাহের কর্মদিবসে কোনো স্থানীয় রেস্তোরাঁয় ‘মেনু দেল দিয়া’ অর্ডার করতে পারেন। সাধারণত এটি তিন পদবিশিষ্ট দৈনিক খাবারের মেনু।
আর একটি ভালো কৌশল হলো, যে রেস্তোরাঁয় স্থানীয় মানুষের ভিড় বেশি, সেটি বেছে নেওয়া। বাইরে চকবোর্ডে দিনের খাবারের তালিকা লেখা থাকলে সেটিও তাজা ও মৌসুমি খাবারের ইঙ্গিত হতে পারে।
বারে স্থানীয়দের মতো পানীয় উপভোগ করতে চাইলে অর্ডার করতে পারেন তিন্তো দে ভেরানো। এটি লাল ওয়াইন ও লেমনেডের মিশ্রণ। চাইলে ছোট গ্লাসের কানিয়া ড্রাফট বিয়ারও নিতে পারেন।
ভ্রমণে শুধু জায়গা নয়, সংস্কৃতিও জানুন
স্পেন ভ্রমণে ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমুদ্রসৈকত কিংবা বিখ্যাত খাবারের পাশাপাশি দেশটির সামাজিক রীতিনীতিও জানা থাকলে অভিজ্ঞতা হবে আরও আনন্দদায়ক।
কখন লাইনে দাঁড়াতে হবে, খাবারের পর কতক্ষণ টেবিলে বসে থাকা স্বাভাবিক, দুপুরের গরম কীভাবে এড়াতে হবে কিংবা কোন খাবার কখন খাওয়া ভালো এমন ছোট ছোট বিষয়ই একজন পর্যটককে স্থানীয় সংস্কৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: বিবিসি









