সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা, সংসদে সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব দেওয়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রীদের ‘ভুল’ ধরতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ গঠন করেছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের পর থেকেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু হয়। গত মাসে এটি পুরোদমে সক্রিয় হয়েছে।
জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি পর্যালোচনা করে তা তুলে ধরা হবে। এ জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমে একজন প্রধানের পাশাপাশি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক ছাত্রশিবির নেতাদের যুক্ত করা হয়েছে।’
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর ছায়া মন্ত্রিসভায় কারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যেভাবে গঠন করা হয়েছে ছায়া মন্ত্রিসভা
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা এসেছে। সেখানে এটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। এ ব্যবস্থায় সংসদের বিরোধী দল একটি বিকল্প কাঠামো গঠন করে, যার কাজ সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। যুক্তরাজ্য ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে এ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
সরকারের মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকার মতো ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েকজন মিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
জামায়াতের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, পলিসি সামিট ও বিজনেস সামিটে সক্রিয় থাকা পলিসি বিশেষজ্ঞরা এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত রয়েছেন।
জানা গেছে, দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী ধরে গঠিত এই কাঠামোয় শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মুজিবুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ শিশির মনির।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ড. ইলিয়াস মোল্লা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মাওলানা আব্দুল হালিম, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে মারদিয়া মমতাজ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে শফিকুল ইসলাম মাসুদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রফিকুল ইসলাম খান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সাবিকুন্নাহার মুন্নি এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন কামাল হোসেন।
সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মানুষের ছায়া যেমন সবসময় মানুষের সঙ্গে থাকে, তেমনি সরকারের সঙ্গে ছায়ার মতো থেকে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে ভালো-মন্দ তুলে ধরতেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে এবং দেশ পরিচালনায় তাদের সতর্ক রাখতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্দেশ্য কেবল দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে। এর মধ্যে দিয়ে আমরা সরকারের ভালো দিক যেমন তুলে ধরবো, তেমনি মন্দ দিকও জাতির সামনে তুলে ধরবো। তাদের ভুলগুলো ধরে সঠিক পথে আনাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এক্সপার্টদের নিয়ে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয় দলের একজন শীর্ষ নেতার পাশাপাশি সেই কাজে এক্সপার্ট এমন লোকজন নিয়ে এটা গঠন করা হয়েছে।’
কবে নাগাদ ছায়া মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে—জানতে চাইলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সেটা দলীয় সিদ্ধান্ত। দল যখন উপযুক্ত সময় মনে করবে, তখন এটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে। এখন আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
বিএনপি যা বলছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ওপর আলোচনার সময় বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভাকে ‘উজিরে খামোখা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘আমি জেনে খুশি হয়েছি আপনারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। ছায়া মন্ত্রিসভা করলে দুইটা লাভ। একটা হলো যে দায়িত্ববোধ বাড়ে, আরেকটা হলো যে উজিরে খামোখা বা মন্ত্রী মন্ত্রী ভাবের একটা সুখ পাওয়া যায়। আমি অভিনন্দন জানাই তাদের।’
তবে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমি এটাকে খুবই পজিটিভভাবে দেখছি। ছায়া মন্ত্রিসভা গণতন্ত্রের জন্য ভালো। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। এরমধ্যে দিয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।’
সরকারদলীয় এই হুইপ আরও বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভার মধ্যে দিয়ে ওনারা সরকারকে নেগেটিভলি পেশ না করে বলতে পারেন যে এটা ভালো হবে, ওটা ভালো হবে না। এমনকি প্রশংসাও করতে পারেন, সরকার যেটা ভালো করেছে। আমি একজন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী। গণতন্ত্রের জন্য যেটা ভালো আমি সবসময় তার পক্ষে। আমি সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাধুবাদ জানাই।’

বিগত দিনে গুমকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার করা হয়েছে: রিজভীফ







