পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের ইতিহাসে হিমালয়ের দুর্গম পথ, দুঃসাহসী পর্বতারোহী আর শেরপাদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তবে এই ঐতিহাসিক অভিযানের প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের একটি পাহাড়ি হোটেলের নামও। স্নোডোনিয়া অঞ্চলের পেন-ই-গ্রিড হোটেল ১৯৫৩ সালের ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতিশিবির হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সাত দশকেরও বেশি সময় পরও হোটেলটি ধরে রেখেছে সেই অভিযানের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও পর্বতারোহণের সংস্কৃতি।
শেরপা তেনজিং নোরগের জীবন ও এভারেস্ট অভিযানের গল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘তেনজিং’ মুক্তির মধ্য দিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে ওয়েলসের পেন-ই-গ্রিড হোটেলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর আগে অভিযাত্রীদের দক্ষতা যাচাই, সরঞ্জাম পরীক্ষা এবং কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছিল এই হোটেলকে ঘিরে।
এভারেস্ট জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৫৩ সালের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি ও নেপালের শেরপা তেনজিং নোরগে সফলভাবে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। এই সাফল্যের খবর যুক্তরাজ্যে পৌঁছায় দুই দিন পর, ২ জুন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেকের দিন।
ওয়েলসের এরিরি, যা স্নোডোনিয়া নামেও পরিচিত, অঞ্চলের পেন-ই-গ্রিড হোটেলে তখন অবস্থান করছিলেন অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গভীর রাতে হোটেলের মালিক ক্রিস্টোফার ব্রিগসের কাছে ফোনে এভারেস্ট জয়ের খবর পৌঁছালে হোটেলজুড়ে শুরু হয় উদ্যাপন। অতিথিদের ঘুম ভাঙিয়ে আনন্দের খবর জানানো হয়, খোলা হয় শ্যাম্পেনের বোতল।
এই সাফল্যের পর হিলারি ও তেনজিং আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় বর্ণনায় তেনজিংয়ের অবদান অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ ১৯৫৩ সালের অভিযানের আগে এভারেস্টে আরোহণের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৫২ সালে সুইস পর্বতারোহী রেমন্ড ল্যামবার্টের সঙ্গে তিনি চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও অক্সিজেনের সীমাবদ্ধতার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। সেই অভিযানে তাঁরা উচ্চতায় আরোহণের নতুন রেকর্ড গড়েছিলেন।
তেনজিংকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্ন, পর্বতারোহী হিসাবে দক্ষতা এবং এভারেস্ট অভিযানে তাঁর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বতারোহণ অভিযানের ইতিহাস নতুনভাবে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযানের প্রস্তুতিশিবির পেন-ই-গ্রিড
ওয়েলসের ইয়ার উইডফা বা স্নোডন পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত পেন-ই-গ্রিড হোটেলটি ১৯৫৩ সালের অভিযানের প্রস্তুতির জন্য বেছে নিয়েছিলেন দলনেতা কর্নেল জন হান্ট। হিমালয়ান কমিটির দায়িত্বে অভিযাত্রী দল গঠনের পর এই হোটেল হয়ে ওঠে তাঁদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এভারেস্টের মতো উচ্চতায় আরোহণের জন্য শুধু শারীরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিশেষায়িত সরঞ্জাম ব্যবহারের দক্ষতা, প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার প্রস্তুতি এবং পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। পেন-ই-গ্রিডে অভিযাত্রীরা এসব বিষয়েই অনুশীলন করেন।
দলের সদস্যরা কয়েক সপ্তাহ ধরে স্নোডোনিয়ার বিপজ্জনক ক্রিব গখ শৈলশিরা ও ওয়াই লিভেড পর্বতে আরোহণের অনুশীলন করেন। এ সময় পরীক্ষা করা হয় উচ্চতায় ব্যবহারের উপযোগী নতুন ধরনের পর্বতারোহণের বুট। আগের চামড়ার তৈরি, পেরেক বসানো তলার বুটের তুলনায় নতুন বুটগুলো বরফ ও প্রচণ্ড ঠান্ডায় বেশি সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া পরীক্ষা করা হয় বিশেষ অক্সিজেন সরঞ্জাম, যার মধ্যে ছিল ক্লোজড-সার্কিট অক্সিজেন ব্যবস্থা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আট হাজার মিটারের ওপরে অবস্থিত ‘ডেথ জোনে’ অক্সিজেনের ঘাটতি মানুষের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। তাই এভারেস্ট অভিযানে এসব সরঞ্জামের কার্যকারিতা যাচাই ছিল প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হোটেলজুড়ে এভারেস্ট অভিযানের স্মারক
পেন-ই-গ্রিড হোটেলের অন্যতম আকর্ষণ এর ঐতিহাসিক স্মারক সংগ্রহ। কাচের আলমারিতে সংরক্ষিত রয়েছে ১৯৫৩ সালের অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরঞ্জাম ও স্মৃতিচিহ্ন। এর মধ্যে রয়েছে পর্বতারোহণের গগলস, বরফ কাটার কুঠার, কম্পাস এবং ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া একটি টিনের মগ।
সংগ্রহে রয়েছে শেরপাদের আঙুলের ছাপ সংবলিত একটি নথিও। সে সময় অভিযানে অংশ নেওয়া অনেক শেরপা পড়তে বা লিখতে পারতেন না। ফলে তাঁদের পরিচয় ও নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
হোটেলের স্মোক রুমও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ স্থান। কাঠের প্যানেলে সাজানো এই ছোট্ট বারকক্ষে দেয়ালজুড়ে রয়েছে এভারেস্ট অভিযাত্রীদের ছবি। একটি ছবিতে তেনজিং নোরগেকে দেখা যায় অভিযানের সর্বকনিষ্ঠ পর্বতারোহী জর্জ ব্যান্ডের সঙ্গে চা পান করতে। অন্য একটি ছবিতে তিনি রয়েছেন দলনেতা জন হান্টের সঙ্গে, স্নোডোনিয়ার বিখ্যাত ট্রাইফান পর্বতের পাথুরে অংশে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবন থেকে জনপ্রিয় পাহাড়ি হোটেল
পেন-ই-গ্রিড হোটেলের বর্তমান পরিচয়ের পেছনে রয়েছে ক্রিস্টোফার ব্রিগসের উদ্যোগ। তাঁর নাতি নিক পুলির বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিগসের আদি বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডের স্কারবোরোতে। তিনি পেশায় রসায়নবিদ ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমা হামলায় তাঁর দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে এক বন্ধুর কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে ওয়েলসে হোটেলটি কেনেন।
যুদ্ধের সময় ভবনটি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে সরিয়ে আনা শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে সেটির অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ব্রিগস হোটেলটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এভারেস্ট অভিযানের সঙ্গে এর সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হোটেলটির পরিচিতি আরও বাড়ে।
বর্তমানে ব্রিগস পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্য নিক ও রুপার্ট পুলি হোটেলটি পরিচালনা করছেন। তাঁদের লক্ষ্য এর ঐতিহাসিক পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের আতিথেয়তার ঐতিহ্য ধরে রাখা।
তরুণ পর্বতারোহীদের জন্য বিশেষ ঐতিহ্য
পেন-ই-গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো ‘স্নোডন ক্লাব’। হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ব্রিগস এই ক্লাব চালু করেছিলেন তরুণ পর্বতারোহীদের উৎসাহিত করতে।
১৬ বছরের কম বয়সী যেসব কিশোর-কিশোরী স্নোডন পর্বতে আরোহণ করে, তারা ক্লাবের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে। সেখানে পাহাড় ও পর্বতারোহণ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান যাচাই করা হয়। সঠিক উত্তর দিতে পারলে তারা এডমন্ড হিলারির ব্যবহৃত টিনের পানপাত্র থেকে লেমনেড পান করার সুযোগ পায়। পাশাপাশি পুরস্কার হিসাবে দেওয়া হয় স্টার্লিং রুপার তৈরি বরফ কাটার কুঠার-আকৃতির একটি ব্যাজ। নতুন সদস্যদের নাম নথিবইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতি নতুন প্রজন্মকে পাহাড়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি হোটেলটির ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত করে।
পাহাড়, ইতিহাস ও অভিযানের আবহ
স্নোডোনিয়া অঞ্চলের পাহাড়ি পরিবেশ, পর্বতারোহণের সুযোগ এবং ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা একে দুঃসাহসিক ভ্রমণপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পাহাড়ে দিনভর ঘোরাঘুরির পর হোটেলের অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে সময় কাটানো এবং অভিযানের পুরোনো গল্প শোনার পরিবেশ এর স্বাতন্ত্র্য বাড়ায়।
১৯৫৩ সালের এভারেস্ট অভিযান দেখিয়েছিল, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছানোর সাফল্য শুধু চূড়ায় ওঠার মুহূর্তে তৈরি হয় না। তার পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, সরঞ্জামের পরীক্ষা, দক্ষতার অনুশীলন এবং বহু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।