ট্রাভেলগআন্টাঘর থেকে যেভাবে আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক

Send
নাকিবুল আহসান নিশাদ
প্রকাশিত : ১৬:৩৫, জানুয়ারি ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৬, জানুয়ারি ১৪, ২০১৯

বাহাদুর শাহ পার্কভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের স্মৃতিবিজড়িত বাহাদুর শাহ পার্ক ঢাকার ঐতিহ্য ও গৌরব বহন করে আসছে। পুরান ঢাকার সদরঘাটের কাছে লক্ষ্মীবাজারে এই ময়দানের প্রথম নাম ছিল ‘আন্টাঘর’। এরপর এর নামকরণ হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক। এখন এটি বাহাদুর শাহ পার্ক নামে পরিচিত।

চারদিকে লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা ডিম্বাকৃতির পার্কটির পূর্ব ও পশ্চিমে ফটক আছে। ভেতরে চারদিকে পাকা রাস্তা। সেখানে এখন সকাল-বিকাল বিভিন্ন বয়সী মানুষ হাঁটেন।
পার্কটিকে ঘিরে সাতটি রাস্তা একত্রিত হয়েছে, এটাই এর অন্যতম একটি বৈশিট্য হলো। চারপাশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বেশকিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় এটি পুরনো ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া বাংলাবাজার, ইসলামপুর, শাখারীবাজারের মতো ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু এলাকা থেকে বর্তমান ঢাকার নতুন এলাকায় আসার ক্ষেত্রে এই পার্ক এলাকার রাস্তাই প্রধান সড়ক।

বাহাদুর শাহ পার্কঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল এই ময়দানে। স্থানীয়ভাবে ‘আন্টাঘর’ নামে পরিচিত ছিল এটি। ক্লাবঘরটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। এখানে ইংরেজরা বিলিয়ার্ড, টেনিস ও ব্যাডমিন্টন খেলতো আর আড্ডা দিতো। এছাড়া পার্টিও আয়োজন করা হতো।

১৮৫৭ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের আমলে এই ময়দান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ইংরেজ মেরিন সেনারা ঢাকার লালবাগের কেল্লায় দেশীয় সেনাদের নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে আক্রমণ চালায়। কিন্তু সিপাহীরা বাধা দিলে যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুদ্ধে আহত ও পালিয়ে যাওয়া সিপাহীদের ধরে এনে সংক্ষিপ্ত কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারের পর ১১ জন সিপাহীকে আন্টাঘর ময়দানে এনে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। স্থানীয় লোকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে লাশগুলো বহুদিন ধরে এখানকার বিভিন্ন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। মানুষ তখন ভয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। এরপর বহুদিন পর্যন্ত এই ময়দানের চারপাশ দিয়ে হাঁটতে ঢাকাবাসী ভয় পেতো। কারণ জায়গাটি নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাহাদুর শাহ পার্ক১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর এই ময়দানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। ১৯৫৭ সালের আগ পর্যন্ত পার্কটি এই নামেই পরিচিত ছিল।

১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ময়দানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। সেই থেকে এই নামে পরিচিত জায়গাটি।

বাহাদুর শাহ পার্কসিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজরা তাদের সেনাদের স্মরণে আন্টাঘরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল। এখানে ঢাকার নবাব স্যার খাজা আহসানুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ১৮৮৪ সালে হঠাৎ হাফিজুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে নবাব পরিবার তথা পুরো ঢাকা শহর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। তার স্মৃতিরক্ষায় ইংরেজরা এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে।

বাহাদুর শাহ পার্কে চোখে পড়ে একটি স্মৃতিসৌধ। এটি চারটি পিলারের ওপর দাঁড়ানো চারকোনা একটি কাঠামো। এর ওপরে আছে একটি ডোম। অন্যপাশে একটি ওবেলিস্ক, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী হিসেবে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাহাদুর শাহ পার্কযেভাবে যাবেন
ঢাকার বাইরে থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ যেকোনও বাহনে আসা যাবে। বাসে এলে মহাখালী থেকে আজমেরী পরিবহন ও স্কাইলাইন বাস সরাসরি বাহাদুর শাহ পার্কে এসে দাঁড়ায়। গাবতলী থেকে ৭ নম্বর ও সাভার পরিবহন বাস আসে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত। সায়েদাবাদ থেকে বেছে নিতে পারেন রিকশা বা উবার। ট্রেনে এলে কমলাপুর থেকে উবার বা রিকশা করে যাওয়া যায়। লঞ্চে এলে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে বাহাদুর শাহ পার্ক।
ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ