অসম্ভব জায়গায় বানানো আটটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি

Send
ইশতিয়াক হাসান
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, জুন ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩০, জুন ১৬, ২০২০

নিরাপদে থাকার জন্য মানুষ ঘরবাড়ি বানায়। বাসস্থান মৌলিক চাহিদা হলেও এটি নান্দনিক চাহিদার খোরাক হতে পারে। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সৃজনশীল ও রুচিশীল স্থপতিরা সামর্থ্য অনুযায়ী গড়ে তুলেছেন অসাধারণ সুন্দর কিছু বাড়ি। কখনও মনে হয় এগুলো যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার!

তবে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে খাড়া পাহাড়ের ঢালে। এমন আটটি বাড়ির উদাহরণ রইলো এখানে। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বানানো হয়েছে গতানুগতিক ধারার বাইরের এসব অসাধারণ স্থাপনা।

কানাডার নোভা স্কোশিয়ায় ‘ক্লিফ হাউস’ক্লিফ হাউস
কানাডার উপদ্বীপ নোভা স্কোশিয়ায় আটলান্টিক উপকূলে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ক্লিফ হাউস’। এ যেন প্রকৃতির বুকে অনবদ্য উদ্ভাবন। পাহাড়ের উচ্চতা থেকে বাড়িটি স্বাভাবিকই দেখায়। কিন্তু উপকূল থেকে তাকালে বিস্ময় জাগে। মনে হবে যেন এর একটি প্রান্ত পাহাড়ে ঝুলে আছে!

আদতে গ্যালভানাইজ স্টিলের শক্তিশালী কাঠামো দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে এই বাড়ি। দেয়ালের উভয় প্রান্ত কাঠের আবরণ দিয়ে ঢাকা। স্থপতিদের কথায়, সাগরে ভেসে থাকা ঘরের মতো অনুভূতি হয় এটি দেখলে। চারকোণা আকৃতির পুরো বাড়ির কোনও অংশই ভাগ করা নেই। ফলে পুরোটাই বসার ঘর ধরে নেওয়া যায়। শোবার জন্য শুধু ছোট একটি অংশ রয়েছে।

জাপানের হোক্কাইদো দ্বীপের নাইসেকোতে ‘হিরাফু’হিরাফু
জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ হোক্কাইদোর নাইসেকো শহরে অবস্থিত অবকাশযাপনের এই অপরূপ ঘর। পাহাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করতেই স্থাপনাটি ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির। বাড়িটি দেখতে দুটি চারকোণা আকৃতির বাক্সের মতো, এর একটির ওপর আরেকটি বসানো। দেখে মনে হবে যেন এই বুঝি পুরো কাঠামো ঢালে পড়ে যাবে!

প্রবেশের দরজা ও ব্যক্তিগত কক্ষ রয়েছে নিচতলায়। ভেতরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে রান্নাঘর ও বসার ঘরসহ অন্যান্য কক্ষ। পুরো বাড়িটি কংক্রিটের তৈরি। ভেতরের দিকে আলাদা সৌন্দর্য ধরে রাখতে ঢালাই করা হয়নি। বিশাল জানালার সুবাদে প্রকৃতি ও ইট-পাথরের চমৎকার বৈপরিত্য উপভোগ্য।

স্পেনের আলিকান্তের কালপে শহরে ‘হাউস অন দ্য ক্লিফ’হাউস অন দ্য ক্লিফ
স্পেনের আলিকান্তে অঞ্চলের কালপে শহরের এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার বৈশিষ্ট্য জ্যামিতিক নকশা। এটি বেশ খাড়া ঢালে বসানো। এ ধরনের জায়গায় বাড়ি নির্মাণ খুব দুরূহ কাজ। তবে এটি কাল্পনিক তিন মাত্রার আবহ তৈরি করে। পুরো স্থাপনা আশেপাশের পাহাড়ি আমেজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভেতরে কংক্রিটের ঢালাই আর বহির্ভাগে সাদা পলেস্তারের আবরণ। গুণগত মান ও মসৃণ রাখতেই স্থপতিরা এসব বেছে নিয়েছেন। পুরোপুরি উজ্জ্বল সামনের অংশে সাগরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। বিশাল সুইমিং পুল ও খোলা বিস্তৃত ছাদের সুবাদে মনে হবে যেন বাড়িটি সমুদ্রকে ছুঁয়ে দেবে!

চীনের আনহুই প্রদেশে ‘কিউনশান ট্রি হাউস’কিউনশান ট্রি হাউস
চীনের শুনাং কাউন্টিতে গড়া কিউনশান ট্রি হাউস কিন্তু কোনও গাছের ওপর বানানো নয়। ৩৬ ফুট (১১ মিটার) উঁচু বাড়িটি পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশে লাল দেবদারুন বনের ভেতর অবস্থিত। সরু ও বাঁকা প্রবেশপথ যেন পাশের রাস্তার অনুকরণ! নিচের কক্ষ থেকে ওপরেরটির অবস্থান সমান নয়, বরং বিপরীতমুখী! মাঝে দিয়ে একটি গোল সিঁড়ি সব কক্ষের সঙ্গে যুক্ত। দেয়ালের একপাশ পুরোটাই জানালা। সব মিলিয়ে বাড়িটি অপূর্ব।

বসার ঘর ও শোবার ঘর তুলনামূলক ছোট, কেননা স্থপতি এটি পারিবারিক বাড়ির চেয়ে বরং দর্শনীয় স্থাপনায় পরিণত করতে চেয়েছেন। বাড়িটি নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে প্রাকৃতিক উপাদান। যেমন দেয়ালে দেখা যায় লাল দেবদারু গাছের কাঠ। ফলে একইসঙ্গে এটি কার্যকরী ও নান্দনিকতা পেয়েছে।

পর্তুগালের আলগারভের লুজে ‘ভিলা এসকারপা’ভিলা এসকারপা
স্বপ্নের মতো সুন্দর পর্তুগালের আলগারভে অঞ্চলের লুজ পৌরসভায় রয়েছে দারুণ এই স্থাপনা। খাড়া উঁচু পাহাড়ের ওপর ভারসাম্য বজায় রাখা জ্যামিতিক আকৃতির সাদা বাড়িটি থেকে লুজ গ্রামের সৌন্দর্য বেশ উপভোগ্য। কিন্তু উপকূলটিতে নির্মাণ সংক্রান্ত আইন কঠিন হওয়ায় এটি খুব বেশি বড় করা যায়নি। তবে স্থপতি মারিও মার্টিনস তুলনামূলক ছোট পরিসরেই দৃষ্টিনন্দন করতে পেরেছেন এই বাড়ি। এটি দেখতে অনেকটাই ভূমির ওপর ভাসমান বলে মনে হয়। সেই সঙ্গে ওপরে বর্ধিত ছাদ বাড়তি আলো সংযোজন করেছে। স্থাপনাটি শুধু আকর্ষণীয় বললে কম হবে, এটি বেশ মজবুত। যদিও প্রচণ্ড বাতাস এটি নির্মাণে প্রতিবন্ধক হয়েছিল।

আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে ‘স্লাইস অ্যান্ড ফোল্ড হাউস’স্লাইস অ্যান্ড ফোল্ড হাউস
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িটি অনেকটা ভাঁজ করা অরিগ্যামির মতো (ফোল্ডিং পেপারকে নানান আকৃতিতে সাজানোর জাপানিজ শিল্প)। এর নকশা এমন দারুণভাবে করা হয়েছে যেন প্রতিটি কক্ষে প্রাকৃতিক আলো ঢুকতে পারে।

বাড়ির সম্মুখভাগ ভিন্ন ভিন্ন আকৃতিতে গড়া। সবচেয়ে বড় অংশটির ছাদ থেকে স্যান গ্যাব্রিয়েল পর্বতের বিস্তৃত সৌন্দর্য দেখা যায়। ফরাসি-সুইস স্থপতি ল্যঁ করবুজিয়েরের আধুনিক ভবনে অনুপ্রাণিত এর নকশা। বাড়ির বেশিরভাগ অংশই মাটির নিচে। এ কারণে প্রচুর খনন করতে হয়েছে।

কানাডার ইস্টার্ন টাউনশিপে ‘লা বিনোকল’লা বিনোকল
কানাডার কুইবেক প্রদেশের পর্যটন গন্তব্য ইস্টার্ন টাউনশিপে একটি পাহাড়ের ওপর স্থাপিত বাড়িটি। সামনের জানালা বিশাল আকৃতির হওয়ায় চারপাশে বিস্তৃত সবুজের সমারোহ দারুণ উপভোগ্য। দুটি ভাগে বিভক্ত বাড়িটির ছোট অংশে রয়েছে শোবার কক্ষ। আর বড় অংশে আছে বসার ঘর।

মন্ট্রিল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাচার হিউমেইনের নকশা করা বাড়িটির ছাদ আংশিকভাবে ঝুলন্ত লাগে! গ্রীষ্মের উত্তাপে সূর্যের আলো যেন ঘরে কম ঢুকতে পারে সেভাবেই সাজানো হয়েছে এটি। পাহাড়ের ওপরে থাকায় বাড়িটিকে বেশ শক্তভাবে মাটির সঙ্গে আটকাতে হয়েছে। এছাড়া চারপাশের সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটাতে দেয়াল পোড়া কাঠ দিয়ে মোড়ানো। প্রকৃতির কোলে বাড়িটিকে ক্ষুদ্র লাগলেও এটি এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।

স্পেনে গ্রানাডার সালোব্রেনা শহরে ‘কাসা দেল আকান্তিলাদো’কাসা দেল আকান্তিলাদো
স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের গ্রানাডার সালোব্রেনা শহরের উপকূলে বাড়িটি অবস্থিত। এর নাম ‘কাসা দেল আকান্তিলাদো’। ইংরেজিতে ‘ক্লিফ হাউস’। মূলত ঊনিশ শতকের স্থপতি অ্যান্টনি গাউডির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এটি নকশা করেছে হিলবার্তোলমে নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৪২ ডিগ্রি কোণে এমন স্থাপনা তৈরির কাজ ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং।

পুরো বাড়ি যেন পাহাড়ের ওপর শুয়ে আছে। আর এটি ঢেকে রেখেছে অসাধারণ একটি ছাদ। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে এর ঢেউ খেলানো ছাদ কোনো ড্রাগনের শরীর অথবা সমুদ্রের ঢেউ। দোতলা বাড়িটির একটি অংশে উন্মুক্ত বসার ঘর, অন্য তলায় পরিবারবান্ধব কামরা।

* বেলজিয়ান সংস্থা লানু থেকে প্রকাশিত শিল্পকলা ও নকশা ইতিহাসবিদ আগাটা টোরোমানফের ‘এজি আর্কিটেকচার: লিভিং ইন দ্য মোস্ট ইমপসিবল প্লেসেস’ গ্রন্থ অবলম্বনে

/জেএইচ/
টপ