ফ্রান্সের অ্যাঁ-প্রোভঁস শহর একসময় তার সবচেয়ে বিখ্যাত সন্তান, চিত্রশিল্পী পল সেজানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। অথচ আজ সেই শহরই তাঁর স্মৃতি, শিল্পকর্ম ও শিল্পসৃষ্টির প্রাকৃতিক পটভূমিকে ঘিরে নতুন করে সাজছে। বড় পরিসরের প্রদর্শনী, সংস্কার করা পারিবারিক বাড়ি ও স্টুডিও—সব মিলিয়ে এ গ্রীষ্মে সেজানপ্রেমীদের জন্য অ্যাঁ-প্রোভঁস হয়ে উঠেছে বিশেষ আকর্ষণীয় স্থান।
শহরের নানা প্রান্তে সেজানের উপস্থিতি চোখে পড়ে। তাঁর নামে রয়েছে রাস্তা, স্কুল, সিনেমা হল, এমনকি একটি স্যান্ডউইচও। ঐতিহ্যবাহী পাঁ বানিয়া-র এই স্থানীয় সংস্করণে টুনার বদলে ব্যবহার করা হয় ছাগলের পনির।
কিন্তু সেজানের জীবদ্দশায় ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পরও বহু বছর নিজের শহরেই শিল্পী ছিলেন অনেকটা অবহেলিত। পরবর্তী সময়ে যাঁকে ‘আধুনিক শিল্পের জনক’ বলা হয়, তাঁর ছবিই একসময় অ্যাঁ-প্রোভঁসের প্রধান জাদুঘরে ঠাঁই পায়নি।
সেজানের স্ত্রী অর্তঁস কয়েকটি ছবি শহরের মুসে গ্রানে জাদুঘরে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তৎকালীন পরিচালক অঁরি পঁতিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি সেজানের ছবি জাদুঘরে ঢুকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
সেজানকে ঘিরে নতুন আয়োজন
প্রায় এক শতাব্দী পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এবার অ্যাঁ-প্রোভঁস সেজানকে ঘিরে বড় আয়োজন করেছে। মুসে গ্রানে-তে প্রদর্শিত হচ্ছে ১৩০টিরও বেশি শিল্পকর্ম স্থিরচিত্র, প্রতিকৃতি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যসহ। প্রদর্শনীর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে সেজানের পারিবারিক সম্পত্তি বাসতিদ দ্যু জা দ্যু বফঁ এবং তাঁর স্টুডিও।
প্রায় ৪০ বছর ধরে জা দ্যু বফঁ ছিল সেজানের আশ্রয় ও শিল্পসৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তাঁর ব্যাংকার বাবা ১৮৫৯ সালে ১৮ শতকের এই বাড়িটি কিনেছিলেন। সঙ্গে ছিল খামার ও প্রায় ১৫ হেক্টর জমি।
বাবার সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তরুণ সেজান বাড়ির নিচতলার বিশাল গ্রাঁ সালোঁকে কাজের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় তলায় তাঁর জন্য আলাদা স্টুডিওও তৈরি করা হয়।
২০১৭ সালের মধ্যে বাড়িটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে শুরু হয় দীর্ঘ সংস্কারকাজ। এখন নতুন করে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সবুজে ঘেরা এই ঐতিহাসিক সম্পত্তি। দেয়ালে প্রজেকশনের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে তরুণ সেজানের আঁকা কিছু ছবি। এখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘কার্ড প্লেয়ার্স’ সিরিজের কাজও করেছিলেন।
বাড়ির রান্নাঘর, মাদাম সেজানের শোবার ঘর এবং দ্বিতীয় তলার স্টুডিওও দেখা যায়। ইংরেজি ভাষায় গাইডেড ট্যুরের টিকিট শুরু হচ্ছে ৯.৫০ ইউরো থেকে।
ছবির ভেতরের প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া
জা দ্যু বফঁ-র বাগানে হাঁটলে সেজানের ছবির অনেক দৃশ্য বাস্তবে চোখের সামনে ধরা দেয়। রয়েছে তাঁর আঁকা চেস্টনাট গাছের সারি, পুরোনো খামারবাড়ি এবং চৌকো জলাধার—যা তাঁর অসংখ্য চিত্রকর্মে ফিরে এসেছে।
সিংহ ও ডলফিনের কয়েকটি ভাস্কর্যও এখনও দেখা যায়। যদিও বিশাল প্লেনগাছ ও অরেঞ্জারি পরবর্তী মালিকদের সংযোজন।
১৮৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি বিক্রি হয়ে গেলে সেজান অ্যাঁ-প্রোভঁসের উত্তরে লে লভ এলাকায় নিজের স্টুডিও তৈরি করেন। এখান থেকেই দেখা যেত তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা মঁ সাঁ-ভিক্তোয়ার।
প্রায় এক হাজার মিটার উঁচু এই চুনাপাথরের পর্বতশ্রেণি সেজানের ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে। তিনি এটির ৮০টিরও বেশি দৃশ্য এঁকেছিলেন।
শেষ স্টুডিওতে সেজানের স্মৃতি
অ্যাঁ-প্রোভঁসের পুরোনো শহর থেকে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় সেজানের শেষ স্টুডিওতে। রাস্তাটির নামও এখন অ্যাভিনিউ পল সেজান।
ঐতিহ্যবাহী ধাঁচের বাড়িটির প্রথম তলাজুড়ে রয়েছে বিশাল স্টুডিও। উত্তরমুখী পূর্ণ-উচ্চতার জানালা দিয়ে আলো ঢুকত তাঁর কাজের জায়গায়। এখানেই তিনি ‘বাথার্স’ সিরিজের ছবি আঁকেন। সিরিজটির একটি চিত্র এখন লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে রয়েছে।
পরবর্তী সংস্কার শেষে দর্শনার্থীরা তাঁর ব্যবহৃত কোট, প্যালেট ও ব্যাগসহ ব্যক্তিগত সামগ্রীও দেখতে পারবেন।
শহরের বাইরে গেলেই সেজানের আসল প্রোভঁস
অ্যাঁ-প্রোভঁস শহরকে নিয়ে সেজানের আঁকা ছবি আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম, মাত্র একটি জলরং। কিন্তু শহরের আশপাশের প্রকৃতি নিয়ে তিনি এঁকেছেন শত শত ছবি। তাই তাঁর শিল্পজগতকে বুঝতে হলে শহরের বাইরে বেরিয়ে আসাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর অন্যতম সেরা জায়গা বিবেমুস খনি। রোমান যুগ থেকেই অ্যাঁ-প্রোভঁসের নির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে আসা হলদে-গেরুয়া পাথরের এই খনি সেজানের শিল্পজগতেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেজান এখানে ২৭টি ছবি এঁকেছিলেন। নীল, সবুজ ও গেরুয়ার সমন্বয়ে তাঁর স্বতন্ত্র রঙের ব্যবহার এবং কিউবিজম-পূর্ব শিল্পভাষার বিকাশ এখানে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
খনির বিভিন্ন জায়গায় তাঁর আঁকা ছবির প্রতিলিপি রাখা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা বুঝতে পারেন ঠিক কোন জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে শিল্পী দৃশ্যগুলো এঁকেছিলেন।
সন্ধ্যা ৬টার বিশেষ ভ্রমণে ১৭ ইউরো খরচ করে মঁ সাঁ-ভিক্তোয়ার ওপর সূর্যাস্তও দেখা যায়। চাইলে ৯০ ইউরোতে অর্ধদিবসের বৈদ্যুতিক সাইকেল ট্যুরেও অংশ নেওয়া যায়। তবে মিস্ত্রাল বাতাস বেড়ে দাবানলের ঝুঁকি তৈরি হলে এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গারদানেতে সেজানের অন্যরকম স্মৃতি
অ্যাঁ-প্রোভঁস থেকে প্রায় ৭ মাইল দূরে গারদান। ট্রেনে যেতে সময় লাগে মাত্র আট মিনিট। এখানেই ১৮৮৫-৮৬ সালে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে প্রায় এক বছর ছিলেন সেজান।
শহরের কুর ফোরবাঁ সড়কে তাঁর বাসস্থানের স্মারকফলক রয়েছে। কাছের কোলিন দে ফ্রের ছিল তাঁর খোলা আকাশের স্টুডিও। সেখানে বিনা খরচে হাঁটার একটি পথে তাঁর আঁকা মঁ সাঁ-ভিক্তোয়ার বিভিন্ন দৃশ্যের প্রতিলিপি দেখা যায়।
জুলাই ও আগস্টে শুক্রবারগুলোতে স্থানীয় পর্যটন দফতর ইংরেজি ভাষায় গাইডেড ট্যুরের আয়োজন করে। জনপ্রতি খরচ ১০ ইউরো।
শিল্পীর চোখে দেখা পাহাড় আজও অটুট
গারদানেতে সেজানের অন্তত দুটি ছবিতে দেখা বর্গাকার অবয়বগুলো যে আসলে পুরোনো উইন্ডমিল, সেটিও এখন জানা যায়। শহরের উত্তরে কাতিভেল পাহাড়ে এখনও তিনটি উইন্ডমিল দাঁড়িয়ে আছে। একটির পাখা এখনও অক্ষত এবং দরজার ওপর খোদাই করা রয়েছে ১৫৬৭ সাল।
ঢেউখেলানো পাহাড়, পাইনগাছের ছায়া আর উজ্জ্বল মাটির রংয়ে জায়গাটি যেন সেজানের ক্যানভাস থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য।
অ্যাঁ-প্রোভঁস এ বছর সেজানকে ঘিরে যতই সরব হোক, তাঁর শিল্পের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর সাক্ষাৎ হয়তো শহরের ব্যস্ত পর্যটনপথে নয়। জা দ্যু বফঁ, তাঁর শেষ স্টুডিও, বিবেমুসের পাথুরে পাহাড় আর গারদানের নিরিবিলি পথ ধরে এগোলেই বোঝা যায় সেজানের শিল্পভুবন আসলে একটি শহরের চেয়ে অনেক বড়। সেটি ছড়িয়ে আছে পুরো প্রোভঁসের আলো, পাহাড়, গাছপালা ও ভূদৃশ্যজুড়ে।









