অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়ে ‘মফিজ’ বনে গেলাম: এডিসি ছানোয়ার

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ আগস্ট ২০১৬, ২০:১৭আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৬, ২১:০৪

ছানোয়ার হোসেন, হাসনাত করিম ও তাহমিদ হাসিব খান






গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়ে রীতিমতো ‘মফিজ’ বনে গেছেন বলে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন। সোমবার রাত ৮টায় তিনি এ স্ট্যাটাস দেন। 
ছানোয়ার হোসেনের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো।


একজন ভদ্রমহিলা একটি ফেসবুক কমেন্টে লিখেছেন,
Teacher hasanath korim ke ...shabag a anye fashite julate hobe...than tar lash dog diye khwoate hobe...
চোখ আর বিবেক একসঙ্গে 'থ' খেয়ে গেল এই কমেন্ট দেখে। একজন নারী কতটা কনফিডেন্ট, কনভিন্সড এবং ক্ষুব্ধ হলে এ রকম মন্তব্য ছুড়তে পারেন?
যে ফেসবুক পোস্টের নিচে কমেন্টটি করা হয়েছে, সেই পোস্টটা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। দেখলাম ওই নারীকে প্রভাবিত করতে এই একটি রিপোর্টই যথেষ্ট। এই রিপোর্টটি পড়ে রীতিমতো 'মফিজ' বনে গেলাম। বছরব্যাপী তদন্তের কাজ একবাক্যেই সাবাড় করে দিয়েছেন রিপোর্টার সাহেব। আর শত-সহস্র তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটাঘাঁটি করে বছর গড়িয়ে গেলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আমাদের মনে অনেক সংশয় কাজ করে। বিবেককে কতবার প্রশ্ন করি, কোথাও কি কোন ভুল করছি? বোঝার, দেখার বা বিশ্লেষণের? সিদ্ধান্ত গ্রহণের কয়েকটি স্তর পেরিয়ে চূড়ান্ত 'পুলিশ রিপোর্ট' আদালতে জমা দেই। তারপরও হয়তো ভুল থেকেই যায়।
অতপর আদালত আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পর ক্রস এক্সামিন করে একটা রায় দেন। সে রায়ও আবার উচ্চ আদালতের কয়েকটি স্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার-বিশ্লেষণ করার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়। তবে, সেখানেও আবার রায় পুনর্বিবেচনার একটা সুযোগ থেকে যায় প্রেসিডেন্টের জন্য। ধীর গতিতে হলেও এটাই ন্যায়বিচার।
আর এই রিপোর্টার তদন্ত কাজ একঘণ্টায় একবাক্যেই শেষ করেছেন! তিনি ওই শিক্ষককে নিশ্চিতভাবে 'নাটেরগুরু' হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে লিখেছেন:
‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম গুলশানের হলি আর্টিসানের জঙ্গি হামলা পরিচালনা করেছেন।’
এখানে কোনও দ্বিধা, সন্দেহ, সূত্র, তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য কোনও কিছুই উল্লেখ নেই। শুধু ২-৪টি স্থিরচিত্র এবং কিছু 'কান কথা'র পুঁজি দিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের এই অবস্থা দেখে আমি রীতিমতো অবাক এবং শঙ্কিত। বাক্যের পেছনে একটি '!' (বিস্ময়সূচক) চিহ্ন থাকলেও মনকে বোঝাতে পারতাম। সেটাও নেই। আমি এই অভ্যাসটাকে ভয় পাচ্ছি। যে কেউ যেকোনও সময় এই অভ্যাসের শিকার হতে পারি।

ছানোয়ার হোসেনের ফেসবুক স্ট্যাটাস
এটাকেই বলে ‪#‎মিডিয়া_ট্রায়াল‬?
জনগণ ভাবাবেগ থেকে অনেক কিছুই বলবে, লিখবে, তর্ক করবে; আবার নতুন তথ্য বা যুক্তি পেলে মত বদল করবে। এটাই হয়। কিন্তু গণমাধ্যমের মত বা লেখা বদলানোর কি কোনও সুযোগ আছে? তাহলে তদন্তাধীন কিংবা বিচারাধীন কোনও বিষয় নিয়ে কোনও অগ্রিমম সিদ্ধান্ত প্রচারণা করাটা তদন্ত বা ন্যায়বিচারের জন্য কতটা অন্তরায় তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?
এটি মোটামুটি পরিচিত একটি অনলাইন পত্রিকার নিউজ। এ ছাড়া আরও ২/১টি পত্রিকাতেও এ রকম রিপোর্ট পরিলক্ষিত হয়েছে।
তবে, আমি যে ওই সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে নির্দোষ বলছি, তাও কিন্তু নয়। আবার এই মুহূর্তে ঠিক দোষীও বলতে পারছি না।
কেননা, কোনও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে এমন সন্দেহের উদ্রেক হলে গ্রেফতার করা হয়।
আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে উত্থাপিত অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে 'অভিযোগপত্র' প্রদান করা হয়।
অভিযোগপত্রের যৌক্তিকতা আইনসিদ্ধ হলে আদালতে চার্জ গঠন করা হয়।


অতপর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার চলার পর রায় দেওয়া হয়।
ভদ্রলোক কেবল গ্রেফতার হয়েছেন, এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। অনেকগুলো ধাপ পারি না দিয়েই কি এভাবে দোষী বলা যাবে?
অবশ্যই না। অসংখ্য প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণের পরই বলা সমীচীন হবে এই হাসনাত সাহেব কিংবা তাহমিদ গুলশান হামলায় জড়িত কি জড়িত না? এখন তারা শুধুই সন্দিগ্ধ।
তদন্তাধীন কিংবা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এই ধরনের গসিপ কিংবা অনুমান ভিত্তিক রিউমার তদন্তকারী সংস্থাকে শুধু প্রভাবিতই করে না, বিব্রতও করে। এই ধরনের প্রচারণা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মনে পক্ষপাত, আবেগ, নির্লিপ্ততা, ভয় প্রভৃতির উদ্রেক করতে পারে, যা তদন্তে হস্তক্ষেপ এবং প্রকারান্তরে ন্যায় বিচারের অন্তরায়।
সামাজিক বা গণমাধ্যমের এমন প্রচারণার ফলে তদন্তে কত রকমের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, তার কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ না দিলে সবাই বুঝবে না। এ বিষয়ে অবশ্য অবসর জীবনের আগে কিছু বলাও যাচ্ছে না। তবে, কয়েকখণ্ডের পুস্তক লেখার মশলা এই অল্প পেশাগত অভিজ্ঞতায় হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে ভাবি, এভাবে যারা ভুক্তভোগী হয়েছেন, তাদের অভিশাপের হাত থেকে কেউ কি আমরা রেহাই পাব?
মোদ্দাকথা, 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' ছাড়া একটি জাতি খুব বেশি মানবিক হতে পারে না এবং ন্যায় বিচারও নিশ্চিত করতে পারে না। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ ন্যায়বিচারকে পথভ্রষ্ট করে, আর পথ দেখায় গণপিটুনি কিংবা ক্রসফায়ারের।
/জেইউ/এমএনএইচ/

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ বাস্তবায়নে জামায়াতের বৈঠক 
ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ বাস্তবায়নে জামায়াতের বৈঠক 
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের জামিন বহাল, মুক্তিতে বাধা নেই 
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের জামিন বহাল, মুক্তিতে বাধা নেই 
ঢাবির ফজলুল হক হলের ঘটনা তদন্তে কমিটি
ঢাবির ফজলুল হক হলের ঘটনা তদন্তে কমিটি
৭৫ হাজার রুপি পর্যন্ত কৃষিঋণ পুরো মওকুফের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের
৭৫ হাজার রুপি পর্যন্ত কৃষিঋণ পুরো মওকুফের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের
সর্বাধিক পঠিত
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’