গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সোলায়মান মিয়ার স্ত্রী নুশরাত জাহান টুম্পাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হতে পারে। এর আগে নিহতের স্বজনরা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। এই ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে টুম্পার পরিবার।
সোমবার বেলা আড়াইটায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহেদ পারভেজ ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তার নুশরাত জাহান টুম্পার লাশ উদ্ধার করেন। ময়নাতদন্তের জন্য নিহত টুম্পার লাশ তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যান।
মঙ্গলবার সকালে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ খ ম শফিউজ্জামানের নেতৃত্বে তার ময়নাতদন্ত করা হয়। পাশাপাশি টুম্পার মৃত্যুর কারণ জানতে একটি বোর্ড গঠন করা হয়।
আ খ ম শফিউজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার গলায় রক্তজমাট দাগ ছিল। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখমের চিহ্ন রয়েছে। তার ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে।’
মৃত্যুর আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কিনা—তাও পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘সব বিষয়ে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে।’
এসআই শাহেদ পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নুশরাত জাহান টুম্পা তার স্বামীর সঙ্গে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের বি/২ বাসায় ছিলেন। সোমবার সকালে টুম্পার মা সেলিনা বেগম তাকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিল না। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মেয়েকে আবারও ফোন দেন। কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি ওই বাসায় চলে আসেন। এ সময় বাসার ভেতর থেকে দরজা লাগানো দেখে তিনি অন্যান্য প্রতিবেশীর সহযোগিতায় জানালার গ্রিল ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে দরজা ভেতর থেকে খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর দ্রুত টুম্পাকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর খবর পেয়ে আমরা বেলা আড়াইটায় ওই হাসপাতালে গিয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করে লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসি।’
তিনি বলেন, ‘নিহত টুম্পার ডান কানে ও থুতনির নিচে গোলাকার লাল জখমের চিহ্ন ছিল। দুই হাতের কনুই এবং বগলে লালছে দাগ ও স্যালোয়ারে রক্তের দাগ দেখেছি আমি। তা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।’
টুম্পা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক কোনাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর উপজেলার ভবানিপুর। কাউন্সিলর সোলায়মান তার স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঢাকার উত্তরার ওই বাসাতেই থাকতেন। পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ে হয়।
নিহত টুম্পার চাচা জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রবিবার বিকালে সোলায়মান, টুম্পা ও টুম্পার ভাই সাঈদের স্ত্রীসহ যমুনা ফিউচার পার্ক ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতে বেড়াতে যান। সোলায়মানের মোবাইল দিয়ে টুম্পা ছবি তুলতেছিল। ছবি তোলার সময় একটি মেয়ের সঙ্গে সোলায়মানের ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি দেখেই তার ফোনের মধ্যে। এ নিয়ে সেখানেই তাদের কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। এরপর তারা গাড়িতে করে সবাই বাসায় রওয়ানা দেন। গাড়িতেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। এ সময় সোলায়মান টুম্পাকে খবর আছে বলে হুমকিও দেন। তাদের সন্তান নাফি (১০)সহ সবাইকে উত্তরায় তার নানা নজরুল ইসলামের বাসায় নামিয়ে দিয়ে ওরা দু’জন বাসায় ফেরেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি একশভাগ নিশ্চিত সোলায়মান আমার ভাতিজিকে হত্যা করে বাসার জরুরি দরজা দিয়ে বের হয়ে চাবি ঘরের ভেতরে রেখে পালিয়েছে। সোমবার সকালে কাজের বুয়া বাসায় দরজা বন্ধ দেখে টুম্পার মার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে। এরপর টুম্পার মা ফোন দিয়ে না পাওয়ায় বাসায় চলে আসেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টুম্পার লাশ কোনাবাড়ীতে দাফন করেছি। সোলায়মান বিয়ের পর তিন চার বছর ভালো ছিল। এরপর গত পাঁচ বছর ধরে একটি মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রেখে চলছে। প্রায়ই এটা নিয়ে ঝগড়া হতো ওদের মধ্যে। এছাড়াও সোলায়মানের মাদক নেওয়ার অভ্যাস রয়েছে। আমরা তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিয়েছি।’
এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলী হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বজনদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই সোলায়মান পলাতক রয়েছে। আমরা তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’
হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন
নুশরাত জাহান টুম্পাকে (২৮) হত্যার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত স্বামী গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর সোলায়মান মিয়ার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী। মঙ্গলবার বিকালে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ি এলাকার কোনাবাড়ি-কাশিমপুর সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে স্থানীয়রা অংশ নেয়। মানববন্ধন শেষে এলাকাবাসী একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে।
মানববন্ধনে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর শফিকুল আমিন তপন, আজাহারুল ইসলাম মোল্লা, মো. খলিলুর রহমান, আব্বাস উদ্দিন খোকন, শাহনাজ পারভিন, মাহমুদা আক্তার মুক্তি, শিল্পপতি মফিজুল ইসলাম, জাকির হোসেন, ফারুক হোসেন, ইসমাইল হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা সরবেশ আলী খান, শেখ মো. আক্কাস আলী, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুল্লাহ সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
/এমএনএইচ/








