X
শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২০ মাঘ ১৪২৯

বাংলাদেশ অন্যায় অবিচার মাথা নত করে মেনে নেয়: কিরীটি রায়

উদিসা ইসলাম
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ২২:২৬আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০৬:৩৮

কিরীটি রায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমান্ত হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার কথা বহুবার বলা হলেও সীমান্তে এখনও পাখি শিকারের মতো বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা নিয়মিত ভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। আর এসব ঘটনায় বাংলাদেশের সম্বল কেবলমাত্র বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কড়া প্রতিবাদ ও লাশ ফিরিয়ে আনার জন্য পতাকা বৈঠকে বসা। বিএসএফ-এর এমন মনোভাবের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের মুখ বুজে সব অন্যায় অবিচার মেনে নেওয়াকেই দায়ী করছেন ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) নির্বাহী পরিচালক কিরীটি রায়। তিনি মনে করেন, ভারতের তুলনায় কম ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অন্যায় অবিচার মাথা নত করে মেনে নেয়। যদিও সীমান্তে প্রকৃত অর্থে কী ঘটছে সেটা উভয় সরকার খুব ভাল করে জানে।

গত তিনবছরের হিসেব বলছে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে দুই দেশের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও দিনে দিনে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমাতে সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘটনার যৌথ তদন্তের সিদ্ধান্ত হলেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দুইদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতে চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এখানে প্রতিনিয়ত নিরীহ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। আর বাংলাদেশ সরকারের নমনীয় অবস্থানের কারণেই এটি কমছে না বলেও মনে করছেন তারা।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশকেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ বছর জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সীমান্তে ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই সময়ে মধ্যে আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। অপহৃত হয়েছেন ১৮ জন বাংলাদেশি। বেসরকারি হিসেবে চলতি মাসে লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রামসহ বাংলাদেশ সীমান্তে অন্তত ৮জন নিহতের খবর পাওয়া যায়।

২০১৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিএসএফের হাতে ৪৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে গুলিতে ৩২ জন এবং শারীরিক নির্যাতনে ১৪ জন নিহত হন। তার আগের বছর ২০১৪ সালে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৭৩টি। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন ১৬ জন।

গত জুলাই মাসে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বেনাপোলের পুটখালী সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় একজন গরু ব্যবসায়ী ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে ভারত থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় বিএসএফের আংরাইল ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান শহীদ। গত ১৬ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্তে দুই বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। নিহতরা হলেন গোমস্তাপুর উপজেলার চাড়ালডাঙ্গা গ্রামের মৃত দাউদ আলীর ছেলে যোবদুল হক ও বেগপুর গ্রামের হুকমত আলীর ছেলে ভুট্টু। প্রায় এক সপ্তাহ পর বিএসএফ তাদের লাশ ফেরত দেয়। এর আগে গত ১০ জুন রাজশাহীর পবা উপজেলার চর মাঝাড়দিয়ার সীমান্তে গুলিতে রনি খালাসি নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন। এদিকে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে গত ৯ মাসে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৪ জন, লালমনিরহাট সীমান্তেও বেশ ক’জন নিহতের কথা জানা গেছে।

যদিও গত মে মাসে দুইদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতে, এখন থেকে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঘটলে তার যৌথ তদন্ত হবে জানানো হয়েছিল। ছয়দিন ব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমনই অঙ্গীকার প্রকাশ করেন বিজিবি ও বিএসএফ-এর মহাপরিচালকদ্বয়। এ সময় বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ বলেন, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য আমরা কাজ করেছি। সীমান্তে হত্যাসহ যে কোনও ঘটনা ঘটলে দু’দেশ যৌথভাবে তার তদন্ত করবে।

তারও আগে ২০০৮ সালে বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারত সরকার ও বিএসএফ বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করেছিল যে, সীমান্তে প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, যাতে হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়। তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরও গণমাধ্যমের সামনে এ ধরনের মন্তব্য বহুবার করেছিলেন।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা সীমান্তে হত্যা বন্ধ করছে না। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাও অনেক সময় চোরাচালানিদের হামলার শিকার হয়েছে। কিন্তু তারা কখনও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তা প্রতিরোধ করতে যায়নি। অন্যদিকে, বিএসএফ রীতিমত তাড়া করে সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করছে। এমনকি খুনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে তারা বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকেও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যতগুলো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো ওপার থেকে গরু আনতে গিয়ে ঘটছে বলে চালানো হয়। যদি তাদের দাবি মেনেও নেওয়া হয়, তাহলেও একজন গরুর রাখালকে প্রতিরোধে মারণাস্ত্র ব্যবহার কতটা যৌক্তিক সেটা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়েও যখন এ বিষয়টির সমাধান হয় না, তখন প্রয়োজনে তৃতীয় মাধ্যমের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধান হতে পারে বলে আমি মনে করি। আর সেই তৃতীয় মাধ্যম বা পক্ষটি হলো জাতিসংঘ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) নির্বাহী পরিচালক কিরীটি রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেবল নিহতের পরের ঘটনায় নজর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নিহত হওয়ার আগে কী ঘটছে? বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণ পরস্পরের চাহিদা অনুযায়ী নানাভাবে যাতায়াত করে। আর এই যাতায়াতের কথা দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জানা। আর দু’দেশেরই যে মানুষগুলো অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে কারাগারে আছেন তাদের বিষয়েও সরকার অবহিত। এরপরও এগুলো নিয়ে কোনও কথা হয় না। কারণ, বাংলাদেশ সরকার অন্যায় অবিচারগুলো মুখ বুঁজে মেনে নেয়।’

তিনি বলেন, ‘আর এই মেনে নেওয়ার কারণ, তারা ভারতের থেকে তুলনামূলক কম শক্তিশালী। তিনি আরও বলেন, মানবাধিকারের দিক থেকে সীমান্তের ইস্যুগুলো আমরা আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েও এখনও ফল পাইনি।’

/টিএন/আপ-এনএস/

সর্বশেষ খবর
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
সর্বাধিক পঠিত
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ