কক্ষের চারপাশে নানা রংয়ের বেলুন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খেলনা ও হরেক রকমের খাবার-দেখে মনে হতে পারে কোনও উৎসবের আয়োজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই আয়োজন করা হয়েছে পার্বতীপুরে নির্যাতনের শিকার শিশু পূজার মানসিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য। মা ও নানীর সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বললেও অন্যদের দেখলে আঁতকে উঠছে সে। এমনকি নার্স দেখলেও কান্না করে। দায়িত্বরত ডাক্তাররা বলছেন, তার মধ্যে এখনও আতঙ্ক কাজ করছে। অপরিচিত কাউকে দেখলে প্রতিক্রিয়া দেখায়। স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। তাকে এই অবস্থা থেকে বের করে স্বাভাবিক করতে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঢামেক ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর ডা. বিলকিস বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ সে। অপরিচিত লোকজন একেবারেই সহ্য করছে না। তার জন্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রুমের চারপাশে বেলুন লাগানো হয়েছে, দেওয়া হয়েছে খেলনা। তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা চলছে। আশাকরি ধীরে ধীরে সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ‘আজকে সকালেও শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর আশরাফুল হক ও গাইনি বিভাগের প্রধান প্রফেসর সালমা রউফ তাকে দেখে গেছেন। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে আগের ওষুধদের সঙ্গে নতুন কিছু ওষুধ দিয়েছেন সঙ্গে কয়েকটা বন্ধ রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ডাবের পানি, মধু, ফল খেতে বলা হয়েছে।’ শিশু পূজার খাওয়া দাওয়া স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান বিলকিস বেগম।
খাওয়ার বিভিন্ন আবদারের পাশাপাশি বাইরে খেলতে যাওয়ার জন্য বারবার আঁকুতি জানাচ্ছে শিশু পূজা। তার মা জানান, ‘এখন খানিকটা ভালো। খাইতে চায়। বাইরে ঘুরতে চায়। খেলার জন্য কান্না করে। আবার আমাদের বাইরে কাউকে দেখলে ভয় পায়। মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। চোখের সমস্যাটাও কিছুটা রয়েছে।’
শিশু পূজার চিকিৎসা ব্যয় বহনের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। এদিকে শনিবার দুপুরে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘সন্ধান ‘ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের পক্ষ থেকে পূজার পরিবারকে এক লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এসময় ওসিসি কো-অর্ডিনেটর বিলকিস বেগম, সন্ধানী ফরিদপুর ইউনিটের সভাপতি কামাল আহমেদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর দিনাজপুরের পার্বতীপুরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির বাইরে খেলতে যাওয়ার পর থেকে শিশু পূজাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খুঁজেও তাকে না পেয়ে রাত ১১টার দিকে পার্বতীপুর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার বাবা সুবল দাস। পরে ১৯ অক্টোবর ভোর ৬টায় ওই শিশুটিকে বাড়ির পাশের হলুদ ক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ২৫ অক্টোবর উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় ঢামেক হাসপাতালে। পরবর্তী তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে(ওসিসি) রাখা হয়।
এ ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর শিশুটির বাবা একই গ্রামের জহির উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪২) ও আফজাল হোসেন কবিরাজকে (৪৮) আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পার্বতীপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সোমবার রাতে সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে সে ৭ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর আসামি সাইফুল ইসলামের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে দিনাজপুর আমলী আদালত-৫। পুলিশ তার ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ৭ দিন মঞ্জুর করেন সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কৃষ্ণ কমল রায়।
পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মাহমুদুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তদন্ত চলছে। আমরা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। আজ ২৯ অক্টোবর দ্বিতীয় দিন। রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।
/আরজে/টিএন/আপ-এনএস/








