আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া ইয়াসিন মোহাম্মদ আব্দুস সামাদকে (৩৫) ছাড়িয়ে আনার কথা বলে যে ব্যক্তি ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন, তাকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তবে তারা ইয়াসিনের সন্ধান দিতে পারেনি। গত পাঁচ মাস ধরে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। শাহবাগের একটি মামলার আসামি ইয়াসিন। তবে ওই মামলায় তাকে এখনও গ্রেফতার দেখানো হয়নি।
রবিবার রাত ৩টায় শাহ আলী থানার দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে সোর্স পরিচয়ে টাকা আত্মসাৎকারী হাজী আলমকে (৪৫) গ্রেফতার করে র্যাব-৪ এর সদস্যরা। এর আগে গত ১৪ জুলাই দুপুরে বনানী পুলিশ ফাঁড়ির রেলস্টেশনের সামনে থকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ইয়াসিনকে। তার মা চিকিৎসক সুরাইয়া পারভীন এই ঘটনায় ভাসানটেক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনার পর হাজী আলম নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয়ে ইয়াসিনকে ছাড়িয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তার মাকে। এজন্য কয়েক দফায় ৫০ লাখ টাকা নেন তিনি। তবে ইয়াসিনকে ছাড়াতে পারেননি আলম। এরপর বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।
তবে এখন পর্যন্ত কোনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াসিনকে গ্রেফতারের বিষয়টি স্বীকার করেনি। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইয়াসিনের মা সুরাইয়া পারভীন তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে গ্রেফতার করার পর বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তিনটি ল্যাপটপ ও একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার নিয়ে যায়। আমি তখনই বুঝতে পেরেছি, আমার ছেলেকে কোনও একটি বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাজী আলম এলাকার ছেলে বা মাস্তানদের পুলিশের কাছ থেকে প্রায়ই ছাড়িয়ে আনেন। তাই তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তাকে টাকা দেওয়ার আগে আমি পরীক্ষাও করেছিলাম। ছেলের তিনটি বিষয় তাকে জেনে আসতে বলছিলাম। সে তা এনে দিয়েছিল, এরপর আমার বিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। তারপর তাকে ঋণ করে টাকা দেই। এতোগুলো টাকা কি মানুষের কাছে থাকে? কিন্তু সে আমার ছেলেকে নিয়ে আসতে পারেনি।’
সুরাইয়া পারভীন বলেন, ‘আমার ছেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আছে। হাজী আলম যদি না-ই আনতে পারবে, তাহলে আমার কাছ থেকে সে টাকা নিল কেন? এজন্যই এই চোরটাকে ধরিয়েছি।’
র্যাব-৪ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) লুৎফুল কবীর জানান, ‘ইয়াসিনকে ছাড়িয়ে আনার কথা বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয়ে হাজী আলম ভিকটিমের মা সুরাইয়া পারভীনের কাছ থেকে দফায় দফায় ৫০ লাখ টাকা নিয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমরা তদন্ত শুরু করি। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হাজী আলম জানিয়েছে, তার কাছে ২৬ লাখ টাকা রয়েছে। বাকি ২৪ লাখ টাকা তিনি তার দুই সহযোগীকে দিয়েছেন। আমরা তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’
অপহরণের পর র্যাব পরিচয়ে ইয়াসিনের বাসায় যারা গিয়েছিল, তারা কি র্যাবের সদস্য? এমন প্রশ্নের জবাবে লুৎফুল কবীর বলেন, ‘যে নামের মেজর ওই বাসায় গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়েছিল, এই নামে কোনও সদস্য র্যাবে নেই। ভুয়া নাম দিয়ে কেউ প্রতারণা করতে পারে।’
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ডিওএইচএসে ইয়াসিনদের নিজেদের বাড়ি। তার বাবা মারা গেছেন, তিনি চিকিৎসক ছিলেন। মা সুরাইয়া পারভীনও চিকিৎসক।
সুরাইয়া পারভীন বলেন, ‘র্যাবের হাতে গ্রেফতার হাজী আলমই আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল। গ্রেফতারের পর আমি তাকে দেখেছি। আমি ভাসানটেক থানায় গিয়েছি।’
ইয়াসিন কোথায় আছে, কিছু জানতে পেরেছেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখনও কোনও সঠিক তথ্য পাইনি। র্যা ব বলতে পারছে না। তবে তাদের কথায় মনে হচ্ছে আমার ছেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেই আছে। তা না হলে বাসার তিনটি ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের কথা জানবে কিভাবে তারা?’
র্যাব-৪ এর সিও লুৎফুল কবীর বলেন, ‘আমরা ইয়াসিনের বিষয়টি এখনও জানতে পারিনি। গ্রেফতারকৃত হাজী আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজ ইয়াসিনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলায় আসামির তালিকায় গুলশান হামলায় জড়িত নিহত নিবরাস ইসলামও ছিল। এমনকি হলি আর্টিজানে নিহত মীর সামিহ মোবাশ্বেরের সঙ্গেও পরিচয় ছিল ইয়াসিনের। মসজিদে মাঝে মাঝে তাদের কথা হতো বলেও জানান ইয়াসিনের মা।
সুরাইয়া পারভীন সোমবার রাতে বলেন, ‘মীর মোবাশ্বেরকে তিনি সামি বলে জানতেন। হলি আর্টিজান ঘটনার পর আমার ছেলেকে মোবাশ্বেরের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। মোবাশ্বেরকে আমার ছেলে চিনতো। তাদের মসজিদে আলাপ হয়েছে বলেও জানিয়েছিল।’
/এআরআর/এআর/এএআর/








