মাথায় গুলি লেগেও বেঁচে গিয়েছিল ল্যাংড়া আমির

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০২ আগস্ট ২০১৭, ১৭:৪৬আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৭, ১৭:৫৫

ল্যাংড়া আমির কেরানীগঞ্জে গত সোমবার (৩১ জুলাই) ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেন আমির ওরফে ল্যাংড়া আমির (৪০)। তবে এটিই প্রথম নয়, আগেও একবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিল সে। ২০১২ সালের নভেম্বরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েও সে যাত্রায় চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে গিয়েছিল সে। তার পাঁচ বছর পর একই ঘটনায় অবসান ঘটল কেরানীগঞ্জের এই মূর্তিমান ত্রাসের।

প্রথম দফার ওই বন্দুকযুদ্ধের পরও ক্ষান্ত হয়নি ল্যাংড়া আমির। আহত হয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। সেখান থেকে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে পালিয়ে যায় এই সন্ত্রাসী। এরপর হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর। কেরানীগঞ্জের সাধারণ মানুষের জন্য বিভীষিকা হয়ে ওঠা এ সন্ত্রাসীকে কিছুতেই ধরতে পারছিল না পুলিশ। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মঙ্গলবার (০১ আগস্ট) ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শাফিউর রহমান তার জনসন রোডের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান।

পুলিশ জানায়, ২০০০ সাল থেকেই ল্যাংড়া আমিরের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অসংখ্য মামলা রয়েছে। তবে ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর ফিল্মি কায়দায় শিশু পরাগ মণ্ডলকে (৬) অপহরণ করে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায় সে। ওইদিন সকাল সোয়া ৭টার দিকে আমির তার সহযোগীদের নিয়ে শুভাঢ্যা এলাকার ব্যবসায়ী বিমল চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে পরাগ মণ্ডলকে স্কুলে যাওয়ার পথে অপহরণ করে। এসময় তারা পরাগের মা লিপি মণ্ডল, বোন পিনাকী মণ্ডল ও গাড়িচালক গুলি নজরুল ইসলামকে গুলি করে আহত করে। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে এতগুলো মানুষকে গুলি করে আহত করে শিশুকে অপহরণের ঘটনা ওই সময় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।

ঘটনার তিনদিন পর ১৪ নভেম্বর পরাগ মণ্ডলকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় মোক্তার হোসেন আমিরসহ ৯ জনকে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

পরাগ অপহরণের ১৪ দিনের মাথায় ২৩ নভেম্বর অপহরণ মামলার প্রধান আসামি ল্যাংড়া আমির গাজীপুরের টঙ্গীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে বলে খবর বের হয়। পরে জানা যায়, মাথায় গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে আছে আমির। সুস্থ হয়ে কারাগারে অবস্থানের এক পর্যায়ে ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট ঢাকার আদালতের হাজতখানা থেকে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যায় সে। এরপর থেকেই সে পলাতক ছিল। পলাতক অবস্থাতেই সে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ওসিকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল সে।

এসপি শাফিউর রহমান বলেন,‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সোমবার বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে সন্ত্রাসী আমিরকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে পুলিশকে জানায় তার ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ ওরিয়েন্টাল টেক্সটাইল মিলের পাশের একটি স্থানে মজুদ আছে।’ এই তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ১২ পুলিশ সদস্যের একটি টিম আমিরকে নিয়ে অভিযানে যায়। মঙ্গলবার মধ্যরাতে সেখানে পৌঁছামাত্র আমিরের সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। এসময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়।

এসপি বলেন, ‘এই সুযোগে ল্যাংড়া আমির পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে দৌঁড়ে তার সহযোগীদের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে ২০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। তখন আমিরকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।’ পরে উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দুই রাউন্ড গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল ও ২৪ ইঞ্চি লম্বা দুটি ছোরা উদ্ধার করা হয়।

কোন পক্ষের গুলিতে আমিরের মৃত্যু হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে এসপি শাফিউর বলেন, ‘এটি তদন্তের পরই বলা যাবে। কারণ, এটি লাইন অব এক্সচেঞ্জের বিষয়। সে কোন দিক দিয়ে পালাতে গিয়ে কার গুলিতে নিহত হয়েছে, সেটা বলা মুশকিল। তদন্তের আগে তা বলা যাচ্ছে না।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘আলোচিত পরাগ অপহরণ মামলাসহ দুটি খুন, দুটি অপহরণ, তিনটি অস্ত্র মামলা, পুলিশের ওপর হামলায় দুটি, পুলিশ হেফাজত থেকে পালানোর একটি, চাঁদা দাবির তিনটি ও গুলি করে আহত করার মামলাসহ ১৪টি মামলার প্রধান আসামি এই ল্যাংড়া আমির। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে।’

২০১৬ সালে আদালত থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর আবারও সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে আমির। কেরানীগঞ্জ এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা চাইতে শুরু করে সে। একের পর এক চাঁদা দাবি এবং তা না পেয়ে গুলি করার ঘটনায় ব্যবসায়ীদের কাছে মূ্র্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয় এই সন্ত্রাসী।  

এসপি শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, ‘গত ২২ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে ডাক্তার নোমান ও তার স্ত্রী শাহানা রিকশাযোগে বাসায় ফেরার সময় পথে কেরানীগঞ্জ র‌্যাব অফিসের কাছাকাছি পৌঁছালে মোক্তার ও তার সহযোগীরা মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়ে রিকশাটি থামায় এবং ২৩ মার্চের মধ্যে ২০ লাখ টাকা না দিলে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে বলে। লাল কালিতে লেখা চাঁদা দাবি সংক্রান্ত একটি চিঠিও ধরিয়ে দেয় সে।’

এসপি জানান, গত ২২ মে শুভাঢ্যা জিয়ানগর মসজিদের সামনে ব্যবসায়ী হাজী নূরুল ইসলামের পায়ে গুলি করে আমির। একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে এক কোটি চাঁদা দাবি করে। দু’দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দেয় সে। এর এক সপ্তাহ পর নুরুল ইসলামের বাড়ির দরজায় পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় আমিরের সহযোগীরা।এই ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুটি মামলা হয়।

গত ৯ জুলাই রাতে চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ী হাজী শাহ আলমকে গুলি করে ল্যাংড়া আমির। বুকে ও পেটে গুলি লাগলেও ভাগ্যক্রম বেঁচে যান শাহ আলম। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়।

সন্ত্রাসী ল্যাংড়া আমিরের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে। জমি ব্যবসার সূত্র ধরে কেরানীগঞ্জের পশ্চিমপাড়া এলাকায় বসবাস শুরু করে সে। পরে জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। পায়ের সমস্যায় ঠিকমতো হাঁটতে না পারায় তাকে ল্যাংড়া আমির নামেই ডাকতেন স্থানীয়রা। সে সবসময় মোটরসাইকেলে চলাফেরা করত।

আমির নিহত হলেও তার গডফাদার কে বা কারা- তা এখনও চিহ্নিত হয়নি জানিয়ে পুলিশ সুপার শাফিউর রহমান বলেন, ‘আমিরের গডফাদারকে চিহ্নিত করা যায়নি। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের শনাক্ত করা গেলেই অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে।’ আমির নিজেই গডফাদারের মতো ছিল বলেও মন্তব্য করেন এসপি।

/এআরআর/এএম

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক